18.4 C
London
August 28, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

রাশিয়ার হামলার হুমকি, ফকল্যান্ডস নিয়ে মার্কিন চাপ—উভয় সংকটে যুক্তরাজ্য

রাশিয়ার সরাসরি সামরিক হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চাপ—দুই দিক থেকেই নতুন কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়েছে যুক্তরাজ্য। একদিকে ইউক্রেনকে ব্রিটিশ অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি দেওয়ার কারণে মস্কো ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে লন্ডনের ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে ব্রিটিশ অবস্থানের প্রতি মার্কিন সমর্থন পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা ২৭ আগস্ট সতর্ক করে বলেন, ইউক্রেন ব্রিটিশ অস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে গেলে ইউক্রেনের ভেতরে এবং দেশের সীমানার বাইরেও ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জাম রুশ হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। মস্কোর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ অস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার ওপর হামলার ঘটনায় লন্ডন ক্রমেই সরাসরি সংঘাতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

মস্কোর সর্বশেষ সতর্কবার্তার পেছনে রয়েছে ইউক্রেনকে ব্রিটিশ নির্মিত দীর্ঘপাল্লার স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্র এবং এর উৎপাদন প্রযুক্তি সরবরাহের সিদ্ধান্ত। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সরকার ইউক্রেনকে এই প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার পর রাশিয়া একাধিকবার সতর্ক করেছে যে পশ্চিমা দেশগুলোর এ ধরনের পদক্ষেপ সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

রাশিয়ার হুমকির ভাষাও এবার আগের তুলনায় কঠোর। জাখারোভা দাবি করেছেন, ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জাম ইউক্রেনের ভেতরে এবং এর বাইরেও রুশ প্রতিক্রিয়ার লক্ষ্য হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ব্রিটেনকে তার বর্তমান নীতি পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতি বদল না হলে এর পরিণতি ‘বিপর্যয়কর’ হতে পারে।

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও যুক্তরাজ্যের ওপর বড় ধরনের চাপের খবর সামনে এসেছে। দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যুক্তরাজ্যের আরও বড় পদক্ষেপ চান। মার্কিন প্রশাসনের পর্যালোচনায় যুক্তরাজ্য ‘বিশেষ নজরদারির’ আওতায় থাকতে পারে বলেও একজন মার্কিন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছেন।

সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ। দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য প্রতিরক্ষা ব্যয় না বাড়ালে ফকল্যান্ডসের ওপর ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনাকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে। ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে ফকল্যান্ডসের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখলেও ব্রিটিশ প্রশাসনকে স্বীকৃতি দেয়। দ্বীপপুঞ্জটির ওপর আর্জেন্টিনারও দীর্ঘদিনের দাবি রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপের মূল কারণ ন্যাটোর ভবিষ্যৎ সামরিক কাঠামো। ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রচলিত প্রতিরক্ষার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। ন্যাটো সদস্যরা ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় এবং আরও ১ দশমিক ৫ শতাংশ নিরাপত্তাসংক্রান্ত অবকাঠামোয় ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইউরোপীয় মিত্ররা দ্রুত সেই সক্ষমতা অর্জন করুক, যাতে ইউরোপের নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমে।

কিন্তু লন্ডনের জন্য এখানেই তৈরি হয়েছে বড় দ্বন্দ্ব। যুক্তরাজ্যকে একদিকে রাশিয়ার সামরিক হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপের কারণে প্রতিরক্ষা বাজেট দ্রুত বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। চ্যান্সেলর জন হিলি অক্টোবরের বাজেটে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির ৩ শতাংশ ব্যয়ের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করবেন না বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এদিকে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, রাশিয়ার নাশকতামূলক তৎপরতা ও সামরিক চাপের কারণে ভুল হিসাব থেকে ন্যাটো ও মস্কোর মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ও সম্পদের পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।

ফলে যুক্তরাজ্যের সামনে এখন এক জটিল কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনকে সমর্থন অব্যাহত রাখলে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে; আবার প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়তে পারে। ফকল্যান্ডস প্রশ্নে মার্কিন অবস্থানকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনার খবর সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে।

তবে রাশিয়ার হুমকিকে সরাসরি যুক্তরাজ্যে হামলা আসন্ন—এমন অর্থে দেখার সুযোগ নেই। মস্কো মূলত ব্রিটিশ অস্ত্র ও প্রযুক্তির মাধ্যমে ইউক্রেনের রাশিয়ায় হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনাকে সম্ভাব্য লক্ষ্য করার কথা বলেছে। একই সময়ে পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন হলো, রাশিয়া ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে যেতে চায় না; বরং হুমকি, নাশকতা ও অন্যান্য ‘হাইব্রিড’ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পশ্চিমা জোটের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সব মিলিয়ে, রাশিয়ার প্রকাশ্য সামরিক হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয়সংক্রান্ত কঠোর চাপ—দুই ঘটনাই ব্রিটেনের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কাঠামো, ফকল্যান্ডস এবং ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা বাজেট—এই চারটি ইস্যু এখন লন্ডনের জন্য পরস্পর জড়িত এক বড় কৌশলগত পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে স্কিলড ওয়ার্কার রুটে অনিয়মঃ কর্মীকে কাজ না দেওয়ায় ক্ষতিপূরণের নির্দেশ

নতুন লেবার সরকার: প্রপার্টি মার্কেট ও অর্থনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন

নিউজ ডেস্ক

ব্রিটেনে জনসংখ্যা সংকট বাড়ছেঃ তবে বাংলাদেশি পরিবারে বাড়ছে শিশুজন্ম