যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য যৌনতা, সম্মতি, নারী-পুরুষের সমতা ও পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করেছে সরকার। নয় পৃষ্ঠার এই নির্দেশনায় যুক্তরাজ্যের আইন ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে আশ্রয়প্রার্থীদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। নির্দেশনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশটির রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আশ্রয়প্রার্থীদের বোঝানো হচ্ছে—ধর্ষণ, ১৬ বছরের কম বয়সী কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্ক এবং পারিবারিক সহিংসতা যুক্তরাজ্যে গুরুতর অপরাধ। এসব অপরাধে কারাদণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িত হলে সরকারি সহায়তা ও আবাসন হারানোর পাশাপাশি আশ্রয়ের আবেদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
নির্দেশনায় যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মতির বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতিটি পরিস্থিতিতে সম্মতি প্রয়োজন। কেউ আগে সম্মতি দিলেও পরে যেকোনো সময় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন। অর্থাৎ পূর্বের সম্মতি পরবর্তী সময়ের জন্য স্বয়ংক্রিয় অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে না।
বিবাহিত দম্পতি কিংবা প্রেমের সম্পর্কে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য বলে জানানো হয়েছে। একজন ব্যক্তি বিবাহিত বা সম্পর্কে থাকলেও প্রতিবার যৌন সম্পর্কের আগে অপর পক্ষের সম্মতি প্রয়োজন। সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, কেউ ঘুমিয়ে থাকলে, মদ্যপ অবস্থায় থাকলে অথবা নিজের মতামত প্রকাশে অক্ষম হলে তিনি যৌন সম্পর্কে সম্মতি দেওয়ার অবস্থায় নেই। ফলে এমন পরিস্থিতিতে যৌন সম্পর্ক স্থাপন আইনগতভাবে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
নারী-পুরুষের সমতার বিষয়টিও নির্দেশনায় আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সমান অধিকার যুক্তরাজ্যের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং আইন দ্বারা তা সুরক্ষিত। একই সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতাকে বেআইনি হিসেবে উল্লেখ করে আশ্রয়প্রার্থীদের এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিশু সুরক্ষার বিষয়েও রয়েছে একাধিক সতর্কতা। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিশুদের খাবার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না এবং কোনো মেয়ের যৌনাঙ্গে আঘাত বা ক্ষতি করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সরকারের এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন। ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের আইন ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে যারা দেশটিতে আসছেন তাদের কাছে বিষয়গুলো স্পষ্ট করে দেওয়া প্রয়োজন।
বার্নহ্যামের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের নীতি পরিষ্কার—কেউ যুক্তরাজ্যের আইন ভঙ্গ করলে তাকে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে যাদের অপসারণ করা সম্ভব, তাদের কারাগার থেকে মুক্ত করে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়েও সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যদি সরকার আইন মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেয়, তাহলে যুক্তরাজ্যের আইন কী এবং দেশের সামাজিক মূল্যবোধ কী—সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো দরকার। নতুন নির্দেশনা দেওয়ার পেছনে এই যুক্তিই কাজ করছে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্দেশনাটি শুধু আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য প্রযোজ্য নয়। যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রেই দেশের আইন ও নিয়ম প্রযোজ্য। তবে আশ্রয়প্রার্থীদের নতুন দেশে বসবাসের ক্ষেত্রে কী ধরনের আচরণ প্রত্যাশিত, সেটি বোঝাতেই বিশেষভাবে এই নির্দেশনা তৈরি করা হয়েছে।
তবে সরকারের উদ্যোগ নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনাও শুরু হয়েছে। ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলপ বলেন, সরকারের উচিত অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশকারীদের নারীদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে তা শেখানোর পরিবর্তে তাদের দেশ থেকে ফেরত পাঠানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
রিফর্ম পার্টির স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফও নির্দেশনাটির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার ভাষায়, এটি সরকারের জন্য একটি ‘লজ্জাজনক’ বিষয় এবং নির্দেশনা প্রকাশের মধ্য দিয়ে সরকার নিজেই আশ্রয়প্রার্থীদের একটি অংশকে নিয়ে উদ্বেগের কথা স্বীকার করছে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে আসা প্রত্যেক ব্যক্তির কাছ থেকেই দেশের আইন মেনে চলার প্রত্যাশা করা হয়। কেউ আইন ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মধ্যে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যান এবং দেশ থেকে অপসারণের মতো পদক্ষেপও থাকতে পারে।
স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীদের প্রত্যাবাসনের সংখ্যা বর্তমান সরকারের সময়ে ২০১০ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এদিকে নতুন নির্দেশনার সময়েই যুক্তরাজ্যের আশ্রয়ব্যবস্থার ওপর চাপের একটি চিত্রও সামনে এসেছে। গত এক বছরে দেশটিতে মোট ৯৩ হাজার ৫২৫ জন আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। এর আগের ১২ মাসে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ১৩০।
নতুন আবেদনকারীদের মধ্যে ৩৮ হাজার ৯৮০ জন ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। আর ৩৬ হাজার ৭১১ জন পড়াশোনা, কাজ কিংবা ভ্রমণের ভিসা নিয়ে যুক্তরাজ্যে আসার পর আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।
ভিসা নিয়ে এসে আশ্রয়ের আবেদনকারীদের মধ্যে ১০ হাজার ৮৩৫ জন শিক্ষার্থী ভিসাধারী, ১৩ হাজার ৯৯৪ জন কর্মভিসাধারী এবং ৭ হাজার ৪৮ জন ভ্রমণ ভিসাধারী ছিলেন। আরও ৪ হাজার ৮৩৪ জনের ছিল অন্যান্য ধরনের বৈধ থাকার অনুমতি।
সরকারের নতুন নির্দেশনা ঘিরে মূল বিতর্ক এখন দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে—আশ্রয়প্রার্থীদের যুক্তরাজ্যের আইন ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা দেওয়া কতটা প্রয়োজন এবং এ ধরনের নির্দেশনা অপরাধ প্রতিরোধে বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে।
সরকারের অবস্থান, যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী সবাইকে দেশের আইন মেনে চলতে হবে এবং আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে অভিবাসন অবস্থান নির্বিশেষে পরিণতি ভোগ করতে হবে। আর বিরোধীদের দাবি, আইন সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধে জড়িত বিদেশি নাগরিকদের দ্রুত অপসারণে আরও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য প্রকাশিত নয় পৃষ্ঠার এই নির্দেশনা শুধু একটি সরকারি তথ্যপত্রে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি যুক্তরাজ্যের অভিবাসননীতি, নারী নিরাপত্তা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং আশ্রয়ব্যবস্থা নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
সূত্রঃ দ্য এক্সপ্রেস
এম.কে

