20.7 C
London
September 26, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশসিলেট

সিলেট বিএনপিতে দুই বলয়ের টানাপোড়েনঃ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাড়ছে অস্বস্তি

সিলেট বিএনপিতে দীর্ঘদিনের গ্রুপিংয়ের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর অনুসারীদের মধ্যে দূরত্ব। দলীয় কর্মসূচি, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্বের প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে একাধিক বলয়। এতে পুরোনো কোন্দল নতুন রূপে ফিরে আসার আশঙ্কা করছেন দলের ত্যাগী ও জ্যেষ্ঠ নেতারা।

সম্প্রতি সিলেট মহানগর বিএনপির কার্যালয় উদ্বোধনের একটি অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিষয়টি আবারও প্রকাশ্যে আসে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির নিজ বাড়িতে মহানগর বিএনপির কার্যালয় উদ্বোধন করলেও অনুষ্ঠানে সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার উপস্থিতি ছিল না। এ ঘটনায় দলের ভেতরে নতুন করে আলোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়।

দলের একাংশের অভিযোগ, সিলেট-১ আসনের রাজনীতিকে ঘিরে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের অনুসারীরা যেমন একটি বলয় তৈরি করছেন, তেমনি সাবেক মেয়র ও বর্তমান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীকে ঘিরেও আলাদা প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে। দুই পক্ষের অনুসারীদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা বলেন, আরিফুল হক চৌধুরী নিজেই গ্রুপিংকে তাজা করে চলেছেন বলে দলের অনেকের ধারণা। তিনি সিলেট শহরের সংসদ সদস্য নন, কিন্তু বিভিন্ন নেতাকর্মীর মাধ্যমে শহরের রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন—এমন আলোচনা দলের ভেতরে রয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে আরিফুল হক চৌধুরীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ওই নেতা আরও বলেন, সিলেটের রাজনীতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের সংস্কৃতিও সমস্যা বাড়াচ্ছে। তার ভাষ্য, কিছু ভূমিখেকো ও বিতর্কিত ব্যক্তি আরিফুল হক চৌধুরীর ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে, নানা অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ কিছু ব্যক্তি খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের বলয়ের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেছেন বলে দলের ভেতরে আলোচনা আছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্যক্তিগত অনুসারী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল রাজনীতি চলতে থাকলে সিলেট বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য আরও দুর্বল হতে পারে।

সিলেট বিএনপিতে গ্রুপিংয়ের ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ও নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে ঘিরে দুটি শক্তিশালী ধারা সক্রিয় ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন বলয়ের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ সিলেট বিএনপির জন্য দীর্ঘদিনের একটি চ্যালেঞ্জ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পাথর কোয়ারি, বালুমহাল ও পরিবহন খাতসহ বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরে মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব নিয়েও তৈরি হয় জটিলতা। নাসিম হোসাইনের পদ স্থগিত, পরে তা প্রত্যাহার এবং পরবর্তী কমিটিতে রেজাউল হাসান কয়েস লোদীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে রাখার বিষয়টি নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়ায়।

এরই মধ্যে ২০২৫ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আরিফুল হক চৌধুরী ও কয়েস লোদীর মধ্যে প্রকাশ্য বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাও সামনে আসে। ফলে মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরও দৃশ্যমান হয়।

শুধু মহানগর নয়, জেলার রাজনীতিতেও রয়েছে একাধিক শক্তিকেন্দ্র। জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীসহ বিভিন্ন নেতাকে ঘিরে আলাদা অনুসারী বলয় তৈরি হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। নির্বাচনি রাজনীতিকে সামনে রেখে এসব বলয়ের পারস্পরিক দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।

এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্যফেরত কয়েকজন সাবেক ছাত্রদল নেতার তৎপরতা। নতুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের কয়েকজনকে তার সঙ্গে বিভিন্ন সময় ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে বলে দলীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। তবে তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা বা কোনো বিশেষ দায়িত্বের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় পর্যায়ে ওই সাবেক ছাত্রদল নেতাদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও সাধারণ মানুষের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে দাবি করেছেন বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী। তাদের অভিযোগ, অতীতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে যাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন রয়েছে, তাদের নতুন করে প্রভাবশালী মহলের আশপাশে দেখা গেলে তৃণমূলের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

সব মিলিয়ে সিলেট বিএনপি এখন একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে মন্ত্রীদের অনুসারীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে জেলা ও মহানগর পর্যায়ে নেতৃত্বের টানাপোড়েন; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিতর্কিত ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ এবং নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠা কয়েকজন সাবেক ছাত্রদল নেতার উপস্থিতি।

দলের ত্যাগী নেতাদের আশঙ্কা, এসব বিরোধ দ্রুত নিরসন না হলে সিলেট বিএনপিতে পুরোনো গ্রুপিং সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। এতে সাংগঠনিক ঐক্য দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর

এম.কে

আরো পড়ুন

নদী ও পানি ব্যবস্থাপনায় চীনের কাছে ৫০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান চেয়েছে বাংলাদেশ

এক সপ্তাহের মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল হবেঃ নাহিদ ইসলাম

পরীক্ষায় ‘না বসার ঘোষণা’ দেশের অর্ধশতাধিক কলেজের এইচএসসি শিক্ষার্থীদের