ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশের প্রবণতা কমে আসায় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রগুলোর পরিবর্তিত কৌশলের কারণে এ বিষয়ে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বার্নহ্যাম বলেন, তিনি রাজনীতিকে “ভিন্নভাবে” পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং তার সরকারের কর্মকাণ্ডের পক্ষে কয়েকটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তার দাবি, চলতি বছরের গ্রীষ্মে ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে আসার সংখ্যা ২০২০ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
তবে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও চ্যানেল পারাপারে উল্লেখযোগ্য পতনের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Migration Observatory-এর হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে প্রায় ১৪,২০০ মানুষ ছোট নৌকায় চ্যানেল পেরিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন—২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৪৪ শতাংশ কম। ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত এক বছরের হিসাবে মোট আগমন ছিল প্রায় ৩০,২০০ জন।
সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, যুক্তরাজ্যে থাকার আইনগত অধিকার নেই—এমন ৮০ হাজারের বেশি মানুষকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, বার্ষিক প্রত্যাবাসনের সংখ্যাও ২০১৬ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসন ও যাদের থাকার অনুমতি নেই, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট করতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার জন্য হোটেলের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে বার্নহ্যাম দাবি করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় বর্তমানে হোটেলে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। সর্বশেষ পরিসংখ্যানেও হোটেল ব্যবহারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। একই সময়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা ২১ শতাংশ কমে প্রায় ৮৬ হাজারে নেমেছে।
তবে ছোট নৌকায় আসা প্রত্যেক ব্যক্তিকে সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে—এমন ধারণা পরিসংখ্যান সমর্থন করে না। সংসদীয় গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ছোট নৌকায় আসা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৯,৭০০ জনকে অন্য দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যা মোট আগমনের প্রায় ৫ শতাংশ।
চ্যানেল সংকট মোকাবিলায় এবার ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথ অভিযান আরও জোরদার করছে ব্রিটেন। নতুন করে ৭৫ সদস্যের একটি বিশেষ ইউনিট উত্তর ফ্রান্সে কার্যক্রম শুরু করেছে। পাশাপাশি মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিশেষ দলের সদস্যসংখ্যা ১৮ থেকে বাড়িয়ে ৩০ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ফ্রান্সের পশ্চিম উপকূলে আরও ৪৫ জন কর্মকর্তা মোতায়েন করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে উত্তর ফ্রান্সে ছোট নৌকা ঠেকাতে নিয়োজিত ফরাসি কর্মকর্তার সংখ্যা প্রায় ১,০৫০ জনে পৌঁছাবে। ব্রিটিশ সরকারের ভাষ্য, মানবপাচারকারীরা এখন আগের কৌশল বদলে বড় আকারের নৌকা ব্যবহার করছে এবং ক্যালের আশপাশের পরিবর্তে আরও পশ্চিমের উপকূল থেকে নৌকা ছাড়ার চেষ্টা করছে।
এই পরিবর্তিত কৌশলই এখন ব্রিটিশ ও ফরাসি কর্তৃপক্ষের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাচারকারীরা অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যক কিন্তু বড় নৌযানে বেশি মানুষ তুলছে। কিছু নৌযানে দুই শতাধিক মানুষ পরিবহনের ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে মোট নৌকা কমলেও প্রতিটি নৌযানের ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য প্রাণহানির আশঙ্কা বাড়ছে।
বার্নহ্যাম তার বক্তব্যে এ কারণেই সতর্ক করে বলেছেন, মানবপাচারকারী চক্রগুলো ক্রমাগত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। ফলে সরকারকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে অপরাধীদের “এক ধাপ এগিয়ে” থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ছোট নৌকার মাধ্যমে অভিবাসন সংকট শুধু ব্রিটেনের একার সমস্যা নয়; এটি একটি সম্মিলিত ইউরোপীয় চ্যালেঞ্জ। তাই ফ্রান্সসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করেই সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে ছোট নৌকা ঠেকাতে চালু থাকা ‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’ ব্যবস্থা নিয়েও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। সংসদীয় গবেষণা অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত এই ব্যবস্থার আওতায় ১,০৮৭ জনকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং ফ্রান্স থেকে ১,১১৭ জনকে যুক্তরাজ্যে নেওয়া হয়েছে। এই পাইলট ব্যবস্থার মেয়াদ ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠকের সময়ও ছোট নৌকা সংকট গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। ব্রিটিশ ও ফরাসি নেতৃত্বের যৌথ প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানবপাচারকারী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, নৌকা ছাড়ার আগেই তা ঠেকানো এবং বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার জন্য অভিবাসীদের পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া বন্ধ করা।
তবে রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি এখনও অত্যন্ত স্পর্শকাতর। চলতি বছর আগমন কমলেও ২০১৮ সাল থেকে ছোট নৌকায় আসা বিপুলসংখ্যক মানুষের আশ্রয় আবেদন, প্রত্যাবাসন এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান—সবকিছুই সরকারের জন্য বড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। সংসদীয় তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছোট নৌকায় আসা ব্যক্তিদের করা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার আশ্রয় আবেদনের মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজারের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল; এর ৫৯ শতাংশে সুরক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে।
ফলে ছোট নৌকায় আগমন কমে যাওয়া বার্নহ্যাম সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা হলেও, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে মানবপাচারকারী চক্রকে কতটা কার্যকরভাবে ভেঙে দেওয়া, আশ্রয় আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং যাদের থাকার অধিকার নেই তাদের প্রত্যাবাসন কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর।
সূত্রঃ অ্যান্ডি বার্নহ্যামের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ
এম.কে

