যুক্তরাজ্যে দুই অসহায় নারীর সোনার গহনা ছিনতাইয়ের ঘটনায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া এক ভারতীয় নাগরিককে দেশ থেকে বহিষ্কার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অভিবাসন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। গুরুতর অপরাধের কারণে তাকে বহিষ্কারের পক্ষে শক্তিশালী জনস্বার্থ থাকলেও স্ত্রী ও দুই সন্তানের পারিবারিক পরিস্থিতি এবং মানবাধিকারগত বিষয় বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত তাকে যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক এই রায়টি বিদেশি অপরাধীদের বহিষ্কার এবং পারিবারিক মানবাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
আইনি কারণে শুধু ‘এবি’ নামে পরিচিত ৩০ বছর বয়সী ওই ভারতীয় নাগরিক ২০১৯ সালে দিনের বেলায় দুই নারীর কাছ থেকে গহনা ছিনতাইয়ের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হন। প্রথম ঘটনায় তিনি সন্তানদের নিয়ে শিশুর গাড়ি ঠেলে হাঁটছিলেন এমন এক নারীর গলার সোনার হার ছিনিয়ে নেন। ছিনতাইয়ের সময় ওই নারী মাটিতে পড়ে গিয়ে কাটা ও ঘষা-লাগার আঘাত পান।
দ্বিতীয় ঘটনায় সত্তরের কোঠার এক বৃদ্ধাকে লক্ষ্য করেন তিনি। বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষারত ওই বৃদ্ধার গলার সোনার চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। আদালতে উঠে আসে, দুটি ছিনতাইয়ের সময়ই তিনি মাদকের প্রভাবে ছিলেন। দুই অপরাধের জন্য তাকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হলেও সাজা একই সঙ্গে কার্যকর হওয়ায় মোট পাঁচ বছরই কারাগারে থাকতে হয়েছে।
এর আগে ২০১৭ সালে মদ্যপ অবস্থায় এক পুরুষ ও এক নারীকে আঘাত করে শারীরিক ক্ষতি করার অপরাধেও তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। ওই মামলায় তাকে ১২ মাসের স্থগিত কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এসব অপরাধের ধারাবাহিকতার কারণে বিচারক তাকে ‘গুরুতর অপরাধী’ হিসেবে বিবেচনা করেন।
বিচারক অ্যানা-রোজ ল্যান্ডেস বলেন, দুই অসহায় নারীকে তাদের সোনার গহনার জন্য লক্ষ্য করে ছিনতাই করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। তার মতে, এসব অপরাধের কারণে তাকে যুক্তরাজ্য থেকে বহিষ্কারের পক্ষে জনস্বার্থ অত্যন্ত শক্তিশালী। এমনকি দোষ স্বীকার না করলে তার কারাদণ্ড পাঁচ বছর ১০ মাস পর্যন্ত হতে পারত।
তবু শেষ পর্যন্ত বহিষ্কার কার্যকর হয়নি। এর প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে তার পারিবারিক পরিস্থিতি। ওই ব্যক্তি একজন ব্রিটিশ নাগরিককে বিয়ে করেছেন এবং তাদের দুই সন্তান রয়েছে। আদালতকে জানানো হয়, তার স্ত্রী একাধিক শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এবং স্বামীই তার প্রধান দেখাশোনাকারী।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ওই নারীর বিষণ্নতা, প্রদাহজনিত বাত, ফাইব্রোমায়ালজিয়া, উদ্বেগ এবং পিওটিএসসহ একাধিক শারীরিক ও মানসিক সমস্যা রয়েছে। স্বামীকে হারালে তার ওপর গুরুতর মানসিক ও বাস্তবিক চাপ তৈরি হবে বলে আদালত বিবেচনা করেছে।
শুধু স্ত্রী নয়, দুই সন্তানের বিষয়টিও বিচারকের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আদালত মনে করে, ওই ব্যক্তি তাদের বাবার ভূমিকা পালন করেন এবং স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে সন্তানদের প্রধান দেখাশোনার দায়িত্বও তিনি পালন করেন। ফলে তাকে বহিষ্কার করলে সন্তানদের বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
ওই পরিবার ভারতে গিয়ে একসঙ্গে বসবাস করতে পারবে কি না, সেটিও বিচার করা হয়। আদালতে দাবি করা হয়, ওই দম্পতির বিরুদ্ধে আত্মীয়দের পক্ষ থেকে হুমকি রয়েছে। বিশেষ করে ওই ব্যক্তির স্ত্রীকে তার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে আদালতকে জানানো হয়।
আদালতে আরও দাবি করা হয়, পাকিস্তানের একজন প্রভাবশালী রাজনীতিক, যিনি ওই নারীর আত্মীয়, তারা ভারতে চলে গেলে তাদের ক্ষতি করার হুমকি দিয়েছেন। বিচারক এই হুমকির বিষয়টিও বিবেচনায় নেন।
ওই ভারতীয় নাগরিকের যুক্তরাজ্যে থাকার ইতিহাসও দীর্ঘ। তিনি ১১ বছর বয়সে প্রথম যুক্তরাজ্যে আসেন। তার বাবা যুক্তরাজ্যে তার মাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর তিনি যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন। পরবর্তীতে ভারতে ফিরে গেলেও নির্ধারিত সময়ের পর আবার যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেন।
তার থাকার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন ২০১৩ সালে প্রত্যাখ্যাত হয়। পরে ২০১৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ব্যক্তিগত কারণে তাকে ৩০ মাসের জন্য থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী আবেদনও প্রত্যাখ্যাত হয়।
২০১৭ সালে ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এক নারীকে বিয়ে করার পর তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এই বিয়েকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ ও হুমকির সৃষ্টি হয় বলে আদালতকে জানানো হয়।
অভিবাসন ট্রাইব্যুনালে মানবাধিকার আইনের ভিত্তিতে বহিষ্কারাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেন ওই ব্যক্তি। শুনানি শেষে বিচারক বলেন, বিদেশি কোনো গুরুতর অপরাধীর ব্রিটিশ স্ত্রী বা সন্তান থাকলেই তাকে যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় না। বরং এমন ক্ষেত্রে পরিবারের স্বার্থকে বহিষ্কারের পক্ষে থাকা শক্তিশালী জনস্বার্থকে অতিক্রম করতে হলে অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যতিক্রমী কারণ প্রয়োজন।
তবে এই মামলায় সেই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি রয়েছে বলে বিচারক মনে করেছেন। তার বিবেচনায়, ওই ব্যক্তিকে স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে পরিবারটির ওপর পরিণতি ‘অত্যন্ত কঠোর’ এমনকি ‘বিধ্বংসী’ হতে পারে।
ফলে দুই নারীর কাছ থেকে সোনার গহনা ছিনতাই, আগের সহিংস অপরাধ এবং পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও ওই ভারতীয় নাগরিককে যুক্তরাজ্য থেকে বহিষ্কার করা হয়নি। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তানের সঙ্গে যুক্তরাজ্যেই থাকার সুযোগ পেয়েছেন।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাজ্যে বিদেশি অপরাধীদের বহিষ্কার এবং মানবাধিকারভিত্তিক আপিল নিয়ে রাজনৈতিক ও জনপরিসরে তীব্র বিতর্ক চলছে। দেশটির অভিবাসন ও আশ্রয়সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালগুলো নিয়মিতভাবে বহিষ্কারসংক্রান্ত মামলায় অপরাধের গুরুত্বের পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্ক, শিশুদের স্বার্থ এবং মানবাধিকারগত পরিস্থিতিও বিবেচনা করে।
সূত্রঃ ডেইলি মেইল ও দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

