রাশিয়া যদি ন্যাটো জোটের কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলা চালায়, তাহলে জোটটি পাল্টা পূর্ণমাত্রার সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করলে রাশিয়াকে দ্রুত পরাজিত করতে পারবে বলে মন্তব্য করেছেন পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়াও ন্যাটোর হাতে রাশিয়ার তুলনায় বিপুল বিমানশক্তি ও দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা রয়েছে।
শনিবার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে অনুষ্ঠিত ইয়াল্টা ইউরোপিয়ান স্ট্র্যাটেজি বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় সিকোরস্কি সম্ভাব্য রাশিয়া-ন্যাটো সংঘাতের প্রসঙ্গে এসব মন্তব্য করেন।
সিকোরস্কি বলেন, রাশিয়া ন্যাটোর ওপর হামলা চালালে এবং ন্যাটো তার সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করলে রাশিয়াকে ‘খুব দ্রুত’ পরাজিত করা সম্ভব। তিনি দাবি করেন, ন্যাটোর বিমানশক্তিতে রাশিয়ার তুলনায় ‘অত্যন্ত বড় ধরনের শ্রেষ্ঠত্ব’ রয়েছে।
পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হিসাবে, ন্যাটো দেশগুলোর সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি সামরিক বিমান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তা না থাকলেও ন্যাটোর বিমানশক্তির এই শ্রেষ্ঠত্ব বজায় থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সিকোরস্কি বিশেষভাবে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, জেএএসএসএম ক্ষেপণাস্ত্র এবং ন্যাটোর দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতার কথা উল্লেখ করেন। তবে তিনি বলেন, এসব সামরিক সক্ষমতার সুনির্দিষ্ট বর্তমান সংখ্যা তিনি সম্প্রতি যাচাই করেননি।
রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো নিয়েও মন্তব্য করেন পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, ইউক্রেন যদি ছয় মাসে রাশিয়ার তেল শোধন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে, তাহলে পোল্যান্ড একই ধরনের সক্ষমতা ব্যবহার করে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাকি অংশে আঘাত হানতে পারবে।
সিকোরস্কির বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা তার মন্তব্যের সমালোচনা করেন এবং তাকে ‘রুশবিদ্বেষী মানসিকতা’র অভিযোগে অভিযুক্ত করেন।
এদিকে রাশিয়া ন্যাটোর ওপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন জল্পনা ও সতর্কবার্তা সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে বাড়লেও মস্কো এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
গত মাসে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ মস্কো সফর করেন। সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে আলোচনার সঙ্গে পরিচিত কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, র্যাটক্লিফের সফরের সময় রাশিয়াকে ন্যাটোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।
তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এসব খবরকে ‘ভীতিকর গল্প’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এগুলোর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই।
ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে রাশিয়ার সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি ট্রেনে রুশ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি ইউক্রেনের সঙ্গে ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ডের সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় ইউরোপে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়।
এ ঘটনার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, এ ধরনের হামলার উদ্দেশ্য পশ্চিমা দেশগুলোকে ইউক্রেনকে সমর্থন করা থেকে ভয় দেখিয়ে বিরত রাখা হতে পারে।
ফিনল্যান্ডের রোভানিয়েমিতে আর্কটিক কৌশলবিষয়ক একটি সম্মেলনে সাংবাদিকদের কালাস বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোর উচিত এর বিপরীত বার্তা দেওয়া—তারা ইউক্রেনের পাশে রয়েছে এবং ভয় পাচ্ছে না।
এদিকে ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে রুশ বাহিনীর ভূখণ্ডগত অগ্রগতি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার ড্রোন পোল্যান্ডের আকাশসীমায় প্রবেশের ঘটনার পর সিকোরস্কি ইউক্রেনের আকাশসীমায় নো-ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠার ধারণার কথাও প্রকাশ্যে তুলেছিলেন।
তবে সিকোরস্কির সর্বশেষ বক্তব্য সরাসরি পোল্যান্ড-রাশিয়া যুদ্ধের ঘোষণা নয়। তার মন্তব্যের মূল প্রেক্ষাপট ছিল রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত এবং সে ক্ষেত্রে ন্যাটোর সম্মিলিত সামরিক সক্ষমতা।
সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, সিবিএস নিউজ ও ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার
এম.কে

