21.6 C
London
August 28, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

হিমালয় কি ভয়ংকর টাইম বোমাঃ নেপালের বিপর্যয়ের পর বাড়ছে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে শঙ্কা

হিমালয় কি ধীরে ধীরে একটি ভয়ংকর প্রাকৃতিক ‘টাইম বোমায়’ পরিণত হচ্ছে? নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সাম্প্রতিক ভয়াবহ দুর্যোগের পর এই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে। হিমবাহ, তুষার ও পার্বত্য ঢালের অস্থিতিশীলতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন—সব মিলিয়ে হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদ, জলবিজ্ঞানী ও ভূতাত্ত্বিকরা।

জে ২৪ ঘণ্টার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের সাম্প্রতিক ভয়াবহ দুর্যোগে ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি নিখোঁজ হয়েছেন। ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে না দেখে বৃহত্তর হিমালয় অঞ্চলের পরিবর্তিত পরিবেশগত পরিস্থিতির অংশ হিসেবে দেখার দাবি উঠেছে। তবে হতাহতের এই সংখ্যা এবং দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট কারণ পৃথক সরকারি বা বৈজ্ঞানিক সূত্রে যাচাই করা প্রয়োজন।

হিমালয় পৃথিবীর তুলনামূলকভাবে নবীন পর্বতমালাগুলোর একটি। ভারতীয় টেকটোনিক প্লেট ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষের কারণে অঞ্চলটি এখনো ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয়। ফলে পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে শিলাস্তর ভঙ্গুর এবং ঢাল অনেক ক্ষেত্রে অস্থিতিশীল। ভূমিকম্প, অতিবৃষ্টি, ভূমিধস ও তুষারধসের মতো ঘটনা এখানে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ দ্রুত সরে যাচ্ছে এবং বরফ ও তুষারের স্বাভাবিক ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময়ের তুলনায় স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, মেঘভাঙা বৃষ্টি এবং আকস্মিক বন্যার মতো ঘটনা পাহাড়ি এলাকায় বিপদের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

হিমবাহ গলে পাহাড়ি এলাকায় তৈরি হওয়া হ্রদগুলোও বিশেষ উদ্বেগের কারণ। কোনো হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়া, ভূমিধস বা অন্য কোনো কারণে এমন হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এ ধরনের ঘটনাকে বলা হয় গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা GLOF। পাহাড়ি উপত্যকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠী এবং নদীর তীরবর্তী অবকাঠামোর জন্য এ ধরনের আকস্মিক বন্যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

পারমাফ্রস্টের গলনও হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে জমাট থাকা মাটি, শিলা, বরফ ও পলির স্তর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে গলে গেলে পাহাড়ের স্থিতিশীলতায় পরিবর্তন আসতে পারে। বরফ ও মাটির বন্ধন দুর্বল হলে শিলা ধস ও ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়ে। পাশাপাশি জমাট মাটিতে থাকা জৈব পদার্থ ভেঙে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও মিথেন নির্গত হলে তা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে আরও তীব্র করার একটি প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।

হিমালয়ের বিভিন্ন এলাকায় অতীতে ঘটে যাওয়া বড় ধরনের দুর্যোগও এই উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে। ২০১৩ সালের কেদারনাথ বিপর্যয়, ২০২১ সালের চামোলি দুর্যোগ এবং ২০২৩ সালের সিকিমের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছিল। এসব ঘটনার পেছনে হিমবাহ, অতিবৃষ্টি, ভূমিধস ও আকস্মিক পানিপ্রবাহসহ একাধিক কারণ কাজ করেছে; প্রতিটি ঘটনাকে একই ধরনের হিমবাহ-ভাঙনের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

হিমালয়ের ওপর বাড়তে থাকা অবকাঠামোগত চাপও উদ্বেগের কারণ। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক, সেতু, বাঁধ ও পর্যটন অবকাঠামোর সম্প্রসারণ পাহাড়ি পরিবেশে মানুষের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথে পরিবর্তন ঘটলে কোনো দুর্যোগের সময় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে।

এই ঝুঁকির প্রভাব শুধু পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। হিমালয় থেকে উৎপন্ন বহু নদী ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ঝিলম, চেনাব, রাভি, বিয়াস, শতদ্রু, গঙ্গা, যমুনা, রামগঙ্গা, কালী, কোসি, গণ্ডক ও ঘাগরার মতো নদী হিমালয় অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এসব নদীর অববাহিকায় বিপুল জনগোষ্ঠী বসবাস করে।

ফলে হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে বড় ধরনের আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস বা হিমবাহ-সম্পর্কিত ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব ভাটির দেশ ও অঞ্চলেও পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, বন্যার আগাম সতর্কতা এবং যৌথ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশসহ হিমালয়সংলগ্ন বিভিন্ন অঞ্চল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পাহাড়ি নদী ও উপত্যকায় বসবাসকারী মানুষের পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক যোগাযোগ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও আকস্মিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে হিমালয়কে আক্ষরিক অর্থে একটি ‘টাইম বোমা’ বলা মূলত একটি রূপক বা সতর্কতামূলক অভিব্যক্তি। এর অর্থ এই নয় যে নির্দিষ্ট কোনো সময়ে একটি একক বিশাল বিপর্যয় অনিবার্য। বরং জলবায়ু পরিবর্তন, ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতা, হিমবাহের পরিবর্তন, চরম বৃষ্টিপাত এবং মানবিক কর্মকাণ্ড—এই সব ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করলে বড় ধরনের দুর্যোগের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

তাই বিশেষজ্ঞদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ ও হ্রদগুলোর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা যাচাই, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করা। একই সঙ্গে ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন ও বাংলাদেশসহ হিমালয় ও এর নদী অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যে দুর্যোগ-তথ্য আদান-প্রদান আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় তাই শুধু একটি দেশের দুর্যোগ নয়—এটি গোটা হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশগত পরিবর্তন ও দুর্যোগ প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।

সূত্রঃ এপি \ রয়টার্স

এম.কে

আরো পড়ুন

বাংলাদেশি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করলো ত্রিপুরার হোটেল মালিকরা

মানুষের মলমূত্র থেকে তৈরি সার নিরাপদ: গবেষণা

ট্রাম্প প্রশাসনে যে দায়িত্ব পেলেন ইলন মাস্ক