যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি অর্জন করেছেন। তার গবেষণার উল্লেখও রয়েছে ২০২৪ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময়। অথচ এত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা থাকার পরও স্থায়ী চাকরি পাচ্ছেন না ৩০ বছর বয়সী মার্কিন গবেষক জ্যাক ভাইস। ২০২৪ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর থেকে তিনি ২ হাজার ৩০০টিরও বেশি চাকরিতে আবেদন করেছেন। এখন বিকল্প পেশা হিসেবে আইন বিষয়ে পড়াশোনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিনির্ভর ড্রোন ব্যবসা শুরুর কথা ভাবছেন তিনি।
জ্যাক ভাইস যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের সল্টলেক সিটির বাসিন্দা। প্রিন্সটনে পিএইচডি শুরু করার আগে তিনি রাইস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ একাডেমিক সম্মানসহ স্নাতক সম্পন্ন করেন। ২০১৮ সালে প্রিন্সটনের ডক্টরাল কর্মসূচিতে যোগ দেন এবং ২০২৪ সালে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি অর্জন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল বরফ গঠনের প্রক্রিয়া, রাসায়নিক নীতি এবং অণুর পারস্পরিক ক্রিয়া।
২০২৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময় মেশিন লার্নিংয়ের বৈজ্ঞানিক প্রয়োগের উদাহরণ হিসেবে বরফ গঠন নিয়ে তার গবেষণার উল্লেখ করে নোবেল কমিটি। ওই বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান জন হপফিল্ড ও জিওফ্রে হিন্টন, মেশিন লার্নিংয়ের ভিত্তি গড়ে তোলায় অবদানের জন্য। তবে জ্যাক ভাইস নিজে নোবেল পুরস্কার পাননি।
পিএইচডি শেষ করার পর ভাইস প্রথমে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে বৈজ্ঞানিক গবেষণার চাকরি এবং জাতীয় গবেষণাগারগুলোতে মর্যাদাপূর্ণ পোস্টডক্টরাল ফেলোশিপের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো উত্তর পাননি। কিছু প্রতিষ্ঠান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। পরে তিনি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংসহ নিজের বিশেষায়িত বিষয়ের বাইরের বিভিন্ন পদেও আবেদন করতে শুরু করেন।
চাকরির সন্ধানে তিনি শুধু অনলাইন আবেদনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। প্রিন্সটন ও রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি খুঁজেছেন এবং নতুন বিনিয়োগ পাওয়া স্টার্টআপগুলোতে চাকরির সম্ভাবনাও যাচাই করেছেন। তবু অধিকাংশ আবেদন থেকে সাক্ষাৎকারের সুযোগ পাননি। এমনকি হিমায়িত খাবার প্রস্তুতকারী একটি প্রতিষ্ঠানে খাদ্য প্রস্তুতের কাজের জন্য আবেদন করেও সাড়া পাননি।
তার মা চিকিৎসক হলি কারভেথ ছেলের চাকরির আবেদনগুলো পর্যালোচনা করে দেখেছেন। আবেদনপত্রে এমন কোনো স্পষ্ট সমস্যা খুঁজে পাননি, যা চাকরি না পাওয়ার কারণ হতে পারে। ছেলের যোগ্যতা ও দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরিস্থিতি বদলাতে না পারায় তিনিও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভাইস মারকোর নামের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এআই প্রশিক্ষণসংক্রান্ত অস্থায়ী কাজ পান। সেখানে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও তরল পদার্থের গতিবিদ্যাসহ নিজের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এআই মডেলের জন্য প্রশ্ন তৈরি এবং সেগুলোর উত্তর মূল্যায়ন করতেন। কাজটির জন্য ঘণ্টাপ্রতি ৭০ ডলার পারিশ্রমিক পেতেন তিনি।
তবে ওই কাজেও নিয়মিত কর্মঘণ্টা ছিল না। কোনো সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজ পেতেন, আবার কোনো সপ্তাহে মাত্র চার ঘণ্টা। পরে কাজের পরিমাণ কমতে কমতে বন্ধ হয়ে যায়। মার্চ মাসে তার চুক্তিও শেষ করে দেওয়া হয়। ফলে উচ্চশিক্ষিত এই গবেষকের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সংকট কাটেনি।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিকেও এ ধরনের সমস্যার একটি প্রেক্ষাপট হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নিয়োগে সতর্ক থাকায় চাকরিপ্রার্থীদের সুযোগ কমছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক আবেদন যাচাই করতে নিয়োগদাতারা এআই-চালিত বাছাইব্যবস্থা ও স্বয়ংক্রিয় ভিডিও সাক্ষাৎকার ব্যবহার করছেন। এতে আবেদনকারীদের সঙ্গে নিয়োগদাতাদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগও সীমিত হচ্ছে।
তবে ভাইসের প্রতিটি ব্যর্থ আবেদন যে এআই ব্যবস্থার কারণে হয়েছে, এমন প্রমাণ নেই। প্রতিবেদনে নিয়োগের ধীরগতি, সীমিত শূন্যপদ এবং আবেদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন বাধাকে তার দীর্ঘ চাকরি অনুসন্ধানের পটভূমি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বর্তমানে ভাইস যুক্তরাষ্ট্রে নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকছেন। দীর্ঘদিন চাকরি না পাওয়ার পরও তিনি গবেষণার চাকরি ও ফেলোশিপের জন্য আবেদন অব্যাহত রেখেছেন। পাশাপাশি বিকল্প পেশার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন। আইন বিষয়ে পড়াশোনার প্রস্তুতি হিসেবে নভেম্বরে ল স্কুল অ্যাডমিশন টেস্ট বা এলএসএটি দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন।
একই সঙ্গে উদ্যোক্তা হওয়ার পরিকল্পনাও করছেন তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় এমন একটি ড্রোন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন, যা এলইডি লেজার ব্যবহার করে মাইর্টল স্পার্জ নামের ক্ষতিকর আগ্রাসী আগাছা ধ্বংস করতে পারবে। এই প্রযুক্তিকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করছেন তিনি।
উচ্চশিক্ষা, গবেষণার স্বীকৃতি এবং বিভিন্ন খাতে চাকরির জন্য দীর্ঘ প্রচেষ্টা—কোনোটিই এখন পর্যন্ত ভাইসকে স্থায়ী কর্মসংস্থান এনে দিতে পারেনি। ফলে তার অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে উচ্চশিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীদের সুযোগ, নিয়োগের ধীরগতি এবং এআই-নির্ভর নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সূত্রঃ দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল\ হিন্দুস্তান টাইমস \ এনডিটিভি
এমকে

