TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

অভিবাসীদের জন্য স্বস্তির খবরঃ ব্রিটেনে আইএলআর অনুমোদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে

যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (ILR) পাওয়ার আবেদন দ্রুত বাড়ছে। জুনের শেষ পর্যন্ত তিন মাসে ৭৩ হাজার ৭৭৫টি আইএলআর আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে। জিবি নিউজের প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, এই সংখ্যা প্রতিটি কর্মদিবসে ১ হাজার ১০০টিরও বেশি সফল আবেদনের সমান।

একই সময়ে অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিলম্ব নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। গত নভেম্বরে তিনি অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য আইএলআর পাওয়ার বর্তমান পাঁচ বছরের যোগ্যতার সময়সীমা দ্বিগুণ করে ১০ বছর করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন।

কিন্তু প্রায় এক বছর পরও গত সপ্তাহে প্রকাশিত হোম অফিসের সর্বশেষ ইমিগ্রেশন রুলস আপডেটে ওই সংস্কারের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি। এর পরই বিরোধীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে, সরকার পরিকল্পিত কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে।

শ্যাডো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ক্রিস ফিল্প শাবানা মাহমুদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। ডেইলি মেইলকে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আইএলআর সংস্কারের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি।

ফিল্পের অভিযোগ, শাবানা মাহমুদ তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি আরও দাবি করেন, লেবার পার্টির বামপন্থী ব্যাকবেঞ্চারদের চাপের কারণে সরকার কঠোর অভিবাসন সংস্কার কার্যকর করতে ভয় পাচ্ছে।

এদিকে আইএলআর অনুমোদনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুনের শেষ পর্যন্ত তিন মাসে ৭৩ হাজার ৭৭৫টি আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি।

শুধু ১২ মাসের হিসাব ধরলে জুন পর্যন্ত ১ লাখ ৯৯ হাজার ৬২৮টি আইএলআর আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা ২৪ শতাংশ বেশি।

শাবানা মাহমুদের প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের সময় পাঁচ বছর থেকে বেড়ে ১০ বছর হতে পারে। অর্থাৎ বর্তমানে প্রচলিত পাঁচ বছরের পথের তুলনায় অপেক্ষার সময় দ্বিগুণ হবে।

আর যারা অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রস্তাবটি আরও কঠোর। তাদের স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা পাওয়ার আগে ৩০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল।

এ ছাড়া অপরাধে জড়িত ব্যক্তি, বেনিফিট গ্রহণকারী অথবা তুলনামূলকভাবে কম কর প্রদানকারীদের জন্যও স্থায়ী বসবাসের পথ দীর্ঘ করার প্রস্তাব ছিল।

প্রস্তাবিত সংস্কার প্রায় ২০ লাখ অভিবাসীর ওপর প্রযোজ্য করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২০২১ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে আসা অভিবাসীরাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সরকারের এই পরিকল্পনা লেবার পার্টির ভেতরেই তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ফেব্রুয়ারিতে ৩৫ জন লেবার এমপি একটি খোলা চিঠিতে প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তাদের যুক্তি ছিল, যারা ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন, তাদের জন্য পরে নিয়ম পরিবর্তন করা অন্যায্য হবে।

জুনে এই বিরোধিতা আরও প্রকাশ্য রূপ নেয়। অ্যাঞ্জেলা রেনার, যিনি পরবর্তী সময়ে হাউজিং অ্যান্ড কমিউনিটিজ সেক্রেটারি হন, প্রস্তাবগুলোকে ‘আন-ব্রিটিশ’ ও ‘ভুল’ বলে মন্তব্য করেন।

জুনে প্রকাশিত লেবার সরকারের ইমিগ্রেশন বিলেও আইএলআর সংস্কারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এসব পরিবর্তন পরবর্তী সময়ে সেকেন্ডারি লেজিসলেশনের মাধ্যমে আনা হতে পারে।

কিন্তু সর্বশেষ ইমিগ্রেশন রুলস আপডেটেও সংস্কারগুলোর কোনো ঘোষণা না আসায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে, হোম অফিসের পূর্বাভাস বলছে, ২০২৮ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের আবেদনের সংখ্যা ৩ লাখ ৫৯ হাজার থেকে ৬ লাখ ২০ হাজারের মধ্যে পৌঁছাতে পারে।

এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে মহামারির পর যুক্তরাজ্যে আসা বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর যোগ্যতার সময়সীমায় পৌঁছানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। হোম অফিসের পরামর্শপত্র অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সংস্কারের আওতায় পড়তে পারেন এমন প্রায় ২০ লাখ অভিবাসীর অধিকাংশ ২০২২ সালের পর যুক্তরাজ্যে এসেছেন। বর্তমান পাঁচ বছরের নিয়ম বহাল থাকলে তাদের অনেকে ২০২৭ সাল থেকে আইএলআরের যোগ্য হতে শুরু করবেন।

যুক্তরাজ্যে দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসনও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন ১৪ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছেছিল এবং একই বছর নিট মাইগ্রেশন রেকর্ড ৯ লাখ ৪৪ হাজারে দাঁড়ায়।

তবে সরকার এখনো প্রস্তাবিত সংস্কার বাতিল করেছে—এমন ঘোষণা দেয়নি। হোম অফিসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, গত নভেম্বরে অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য আইএলআরের স্বাভাবিক যোগ্যতার সময়সীমা ১০ বছরে উন্নীত করার সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা ব্যক্তিদের জন্য অপেক্ষার সময় কম রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।

মুখপাত্র আরও জানান, সংস্কারের কিছু বিষয় নিয়ে পরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এবং সরকার যথাসময়ে এ বিষয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবে।

ফলে বর্তমানে মূল প্রশ্ন হলো—শাবানা মাহমুদের ঘোষিত পাঁচ বছর থেকে ১০ বছরের আইএলআর সংস্কার শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে কি না, নাকি রাজনৈতিক চাপের মুখে পরিকল্পনাটি আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে থাকবে। এরই মধ্যে আইএলআর অনুমোদনের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সূত্রঃ জিবি নিউজ

এম.কে

আরো পড়ুন

আইনে এআই-এর আগমন নিয়ে সতর্ক করলেন যুক্তরাজ্যের সিনিয়র বিচারপতি

এনএইচএসের নিবন্ধিত নার্সদের পরীক্ষায় জালিয়াতি করে পাসের খবর ফাঁস

যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি দুই বছরের সর্বনিম্নে, তবুও রিসেশনের শঙ্কা