TV3 BANGLA
প্রবাসে বাংলাদেশ

অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের উত্থানঃ কাউন্সিল নির্বাচনে ৭ জন বাংলাদেশী

অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের পরিধি বাড়ছে। নিউ সাউথ ওয়েলসের একাধিক কাউন্সিলে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাতজন জনপ্রতিনিধি। তাদের মধ্যে কয়েকজন একাধিকবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন, আবার কয়েকজন ডেপুটি মেয়রের দায়িত্বও পালন করেছেন।

ক্যাম্পবেলটাউন, ক্যামডেন, কাম্বারল্যান্ড, ক্যান্টারবেরি-ব্যাংকসটাউন ও ডাব্বোর স্থানীয় সরকারে তাদের এই উপস্থিতি অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের অংশগ্রহণের একটি চিত্র তুলে ধরেছে। এসব জনপ্রতিনিধির মধ্যে কেউ দলীয় প্রার্থী হিসেবে এবং কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জয় পেয়েছেন।

ক্যাম্পবেলটাউন সিটি কাউন্সিলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মাসুদ চৌধুরী প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন ২০১৬ সালে। এরপর ২০২১ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও জয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯১ সালে লেবার পার্টিতে যোগ দেওয়া মাসুদ চৌধুরী দলটির প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালনকে গর্বের বিষয় উল্লেখ করে মাসুদ চৌধুরী বলেন, এই দায়িত্বের সঙ্গে বড় ধরনের দায়বদ্ধতাও রয়েছে। ক্যাম্পবেলটাউনের সব মানুষের জন্য কাজ করা এবং বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের কথা শোনাকে তিনি নিজের দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার রাজনীতি ও জনসেবায় বাংলাদেশি কমিউনিটির নতুন প্রজন্ম আরও এগিয়ে আসুক—এমন প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।

একই কাউন্সিলে রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মাসুদ খলিল। ২০২১ সালের নির্বাচনে ‘কমিউনিটি ভয়েস’-এর ব্যানারে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। ২০২৩-২৪ মেয়াদে কাউন্সিলরদের ভোটে ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হন। ক্যাম্পবেলটাউনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পাওয়ার পর ২০২৪ সালের নির্বাচনেও পুনর্নির্বাচিত হন তিনি।

মাসুদ খলিল জানান, কমিউনিটির মানুষের বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জে তিনি পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। তবে তার কাজ কোনো নির্দিষ্ট কমিউনিটিতে সীমাবদ্ধ নয়। জাতি, ধর্ম, ভাষা বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে কাউন্সিলের সব মানুষের জন্য কাজ করাই তার লক্ষ্য। স্থানীয় সরকারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাজ্য পর্যায়েও মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে চান তিনি। ২০২৭ সালের নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য নির্বাচনে ম্যাককুয়ারি ফিল্ডস আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছেন তিনি।

ক্যাম্পবেলটাউন সিটি কাউন্সিলের আরেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জনপ্রতিনিধি অ্যাশ রহমান। ২০২৪ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয় পান অ্যাশ রহমান।

এদিকে ২০২৪ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্যান্টারবেরি-ব্যাংকসটাউন সিটি কাউন্সিলে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন শিরিন আক্তার।

ক্যামডেন সিটি কাউন্সিলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন এলিজা রহমান। ২০২৪ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পান তিনি। নিউ সাউথ ওয়েলসে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম নারী হিসেবে এই দায়িত্বে বসেন এলিজা রহমান। পাশাপাশি লেবার পার্টির ক্যামডেন ব্রাঞ্চের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

এলিজা রহমান বলেন, ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হওয়া তার জন্য সম্মানের পাশাপাশি বড় দায়িত্বের বিষয়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে তার এই অর্জন নতুন প্রজন্মের নারীদের জনসেবায় এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে বলে তিনি মনে করেন। ক্যামডেনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে মানুষের কথা শোনাকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

কাম্বারল্যান্ড সিটি কাউন্সিলের ওয়েন্টওর্থভিল ওয়ার্ড থেকে ২০১৭ সালে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন সুমন সাহা। ২০২১ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ২০২২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়রের দায়িত্বও পালন করেন।

সুমন সাহা জানান, কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন তার জন্য গভীর শিক্ষার অভিজ্ঞতা। ওয়েন্টওর্থভিল ওয়ার্ডের মানুষের পাশে থেকে কাজ করার পাশাপাশি স্থানীয় রাস্তার নিরাপত্তা, পার্ক ও খেলার মাঠের উন্নয়ন এবং সবার জন্য সমান ও সহজলভ্য কাউন্সিল সেবা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন তিনি। ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় আসার অভিজ্ঞতার কারণে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জও তিনি বুঝতে পারেন বলে জানান। তরুণদের শিক্ষা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও তার অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।

নিউ সাউথ ওয়েলসের ডাব্বো আঞ্চলিক কাউন্সিলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিবলী চৌধুরী ২০২১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।

শিবলী চৌধুরী জানান, স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, পারস্পরিক সম্প্রীতি এবং আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই তিনি কাজ করছেন। ডাব্বোতে বাংলাদেশি কমিউনিটির সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ ও স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও ঐক্যকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের এই অংশগ্রহণ শুধু নির্বাচনে জয় পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন কাউন্সিলে কাউন্সিলর এবং ডেপুটি মেয়রের মতো দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তারা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়েও যুক্ত হয়েছেন।

অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় নির্বাচনে শুধু নিজস্ব কমিউনিটির সমর্থন যথেষ্ট নয়; বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির ভোটারদের সমর্থন অর্জন করেই নির্বাচিত হতে হয়। ফলে সামাজিক সম্পৃক্ততা, জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এসব জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিক পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

নিউ সাউথ ওয়েলসের বিভিন্ন স্থানীয় সরকারে সাতজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতের নির্বাচিত হওয়া এবং তাদের কয়েকজনের ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পাওয়া অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের স্থানীয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিস্তারের একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র হিসেবে উঠে এসেছে।

সূত্রঃ নিউ সাউথ ওয়েলস ইলেক্টোরাল কমিশন

এম.কে

আরো পড়ুন

লন্ডনে করোনায় মসজিদের ইমামসহ ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু

যুক্তরাজ্যে সন্তান জন্মদানে ষষ্ঠ স্থানে বাংলাদেশিরা

২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ১৮তম ব্রিটিশ কারি অ্যাওয়ার্ড

অনলাইন ডেস্ক