22.3 C
London
October 4, 2026
TV3 BANGLA
মুক্তমত

পৃথিবীতে মাত্র একটি মহাদেশ ছিল, আবার পৃথিবী একটি মহাদেশে পরিনত হবে – মাঝে কোটি কোটি বছর

নাশীত রহমান || লন্ডন || ০৪ অক্টোবর ২০২৬

 

পৃথিবীর ভূগোল কখনো স্থির নয়; বরং এটি এক অবিরাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলে। ভূত্বকের নিচে থাকা টেকটনিক প্লেটগুলো নীরবে কিন্তু নিরবচ্ছিন্নভাবে সরে যায়, সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, ভেঙে যায়, আবার নতুনভাবে গঠিত হয়। এই ধীর গতির নড়াচড়া মানুষের চোখে অদৃশ্য হলেও কোটি কোটি বছরের সঞ্চয়ে পৃথিবীর মানচিত্রকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। আজ আমরা যে সাতটি মহাদেশকে পৃথক সত্তা হিসেবে দেখি, সেগুলো আসলে একসময় একটি বিশাল সুপার মহাদেশের অংশ ছিল। সেই সুপার মহাদেশ—প্যাঞ্জিয়া—প্রায় ২০০ মিলিয়ন বছর আগে ভেঙে যেতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে আজকের পরিচিত মহাদেশগুলোর জন্ম দেয়।

ভূবিজ্ঞানীরা বলেন, মহাদেশের এই বিচ্ছিন্নতা কোনো চূড়ান্ত অবস্থা নয়। পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা ম্যান্টলের স্রোত প্লেটগুলোকে ক্রমাগত ঠেলে দেয়, কখনো দূরে সরিয়ে দেয়, কখনো আবার একত্রিত করে। এই প্রক্রিয়া এতটাই ধীর যে মানুষের জীবদ্দশায় এর কোনো পরিবর্তন বোঝা যায় না। কিন্তু ভূতাত্ত্বিক সময়ের পরিমাপে এটি একটি শক্তিশালী রূপান্তর। বর্তমান গতিবেগ অনুযায়ী মহাদেশগুলো আবারও একে অপরের দিকে এগোচ্ছে। আটলান্টিক মহাসাগর প্রসারিত হচ্ছে, প্রশান্ত মহাসাগর ধীরে ধীরে ছোট হচ্ছে, এবং ইউরেশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া ভবিষ্যতে একত্রিত হয়ে একটি নতুন সুপার মহাদেশ গঠন করতে পারে। বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য নামও দিয়েছেন—অনেকে একে বলেন “প্যাঞ্জিয়া প্রোক্সিমা”, কেউ বলেন “অ্যামাজিয়া”, আবার কেউ কেউ সম্ভাব্য বিন্যাস অনুযায়ী অন্য নামও প্রস্তাব করেছেন।

 

এই সম্ভাব্য সুপার মহাদেশ গঠনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে সময় লাগবে আরও ২০০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন বছর। তখন পৃথিবীর মানচিত্র আজকের মতো থাকবে না। নতুন পর্বতমালা তৈরি হবে, পুরনো উপকূলরেখা বিলীন হবে, মহাসাগরের অবস্থান বদলে যাবে। আমেরিকা ও এশিয়া সংঘর্ষে লিপ্ত হলে হিমালয়ের মতো নতুন পর্বতশ্রেণীর জন্ম হতে পারে। আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে, ভূমধ্যসাগর সংকুচিত হয়ে শেষ পর্যন্ত বিলীন হতে পারে। অস্ট্রেলিয়া উত্তরের দিকে সরে এসে এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। পৃথিবীর জলবায়ুও বদলে যাবে—সুপার মহাদেশের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলোতে বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে, মরুভূমির বিস্তার বাড়তে পারে, উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন জলবায়ু অঞ্চল তৈরি হতে পারে।

ভূবিজ্ঞানীরা আরও বলেন, মহাদেশের এই মিলন-বিচ্ছিন্নতার চক্র পৃথিবীর ইতিহাসে বারবার ঘটেছে। প্যাঞ্জিয়ার আগে ছিল রোডিনিয়া, তারও আগে ছিল কলম্বিয়া বা নুনা। প্রতিটি সুপার মহাদেশ কয়েকশো মিলিয়ন বছর স্থায়ী হয়েছে, তারপর ভেঙে গেছে, আবার নতুন সুপার মহাদেশের জন্ম দিয়েছে। এই চক্রকে বলা হয় সুপার মহাদেশ চক্র—যা পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ তাপ, ম্যান্টলের স্রোত এবং প্লেটের গতিবিধির ওপর নির্ভর করে। এই চক্রের ফলে পৃথিবীর ভূগোল শুধু বদলায় না, বদলে যায় জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য এবং বিবর্তনের গতিপথও। প্যাঞ্জিয়ার ভাঙনের পরই নতুন মহাসাগরের জন্ম হয়, নতুন পরিবেশ তৈরি হয়, এবং জীববৈচিত্র্য বিস্তারের সুযোগ পায়। ভবিষ্যতের সুপার মহাদেশও পৃথিবীর জীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে—যদিও সেই পরিবর্তন মানবসভ্যতার সময়সীমার বাইরে।

 

এই দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীর মানচিত্র কোনো স্থির বাস্তবতা নয়। আজকের পরিচিত মহাদেশগুলো একসময় একত্রে ছিল, আবার ভবিষ্যতে একত্রে হবে। মানুষের দৃষ্টিতে এটি অচিন্তনীয় সময়সীমা হলেও পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একটি স্বাভাবিক, পুনরাবৃত্ত চক্র। মহাদেশের এই নীরব যাত্রা আমাদের শেখায় যে পৃথিবী একটি জীবন্ত গ্রহ—যার ভূত্বক, মহাসাগর, পর্বত এবং ভূমিখণ্ড সবই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলে। কোটি কোটি বছর আগে যেমন একটি সুপার মহাদেশ ছিল, ভবিষ্যতেও তেমন আরেকটি সুপার মহাদেশ গঠিত হবে। এই রূপান্তর পৃথিবীর দীর্ঘ ইতিহাসে আরেকটি নতুন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

 

আরো পড়ুন

কতো আয় হতে চলেছে টিকা আবিষ্কারকদের?

অনলাইন ডেস্ক

ব্রেক্সিটের ব্যর্থতা: রাজনৈতিক কৌশলহীনতা, বিভ্রান্তিকর প্রতিশ্রুতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অদূরদর্শিতার সম্মিলিত ফল

প্রপার্টি বিক্রয়ের উপর ট্যাক্স