স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনকারী সংস্থা ইনডিপেন্ডেন্ট স্কুলস ইন্সপেক্টরেটের (আইএসআই) সর্বশেষ মূল্যায়নে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল হাদিস লতিফিয়া। ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ (অসাধারণ) রেটিং এবং ‘প্রযোজ্য সকল মানদণ্ড পূর্ণ হয়েছে’—এই স্বীকৃতি পাওয়া উপলক্ষে মঙ্গলবার মাদ্রাসার হলরুমে আয়োজিত হয় ‘Inspiring Excellence’ শীর্ষক এক শুকরিয়া মাহফিল। অনুষ্ঠানে অভিভাবক, গভর্নিং বডির সদস্য, শিক্ষক, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, ইমাম, খতিব, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী ও অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী উপস্থিত হন। যৌথ সঞ্চালনায় ছিলেন প্রতিষ্ঠানের কো-হেডটিচার মুফতি মারুফ আহমদ ও হাফিজ মাওলানা আনহার আহমদ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য রাখেন দারুল হাদিস লতিফিয়ার অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ হাসান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমাদের সাম্প্রতিক স্কুল পরিদর্শন প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত এবং মহান আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এই অসাধারণ অর্জন আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির সুস্পষ্ট স্বীকৃতি—যেখানে উচ্চমানের একাডেমিক উৎকর্ষতা এবং পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা একই সঙ্গে বিকশিত হয়েছে। এটি আমাদের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকমণ্ডলীর নিরলস পরিশ্রম, গভর্নিং বডির দূরদর্শী নেতৃত্ব, অভিভাবকদের মূল্যবান সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের কঠোর অধ্যবসায়ের ফল।’
গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান মাওলানা ফারিদ আহমদ চৌধুরী তার বক্তব্যে সহকর্মী গভর্নর, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আজ আমরা এই অসাধারণ স্বীকৃতি উদযাপন করছি। তবে আমরা জানি, সাফল্য কোনো গন্তব্য নয়—এটি একটি দায়িত্ব। এই প্রতিবেদন আমাদেরকে আরও উন্নতি করতে, আমাদের কমিউনিটির আরও ভালোভাবে সেবা করতে এবং এমন এক প্রজন্মের মুসলিম তরুণ গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করবে, যারা ঈমানে দৃঢ়, চরিত্রে অনুকরণীয় এবং সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখতে সক্ষম।’
আইএসআই-এর প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও শিক্ষাদর্শনের উচ্চ প্রশংসা করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘স্কুলের নেতৃত্ব এবং গভর্নরবৃন্দ বিদ্যালয়টির জন্য একটি সুস্পষ্ট ও অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেন। তারা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করেন, যা উচ্চমানের একাডেমিক উৎকর্ষের আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সমন্বিত করে।’ বিদ্যালয়ের সমন্বিত পাঠ্যক্রম প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর মধ্যে একই ধরনের বিষয় কীভাবে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপিত ও বিশ্লেষিত হয়, সে সম্পর্কে গভীর ও সূক্ষ্ম উপলব্ধি গড়ে তোলে।’
শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাফল্য নিয়েও প্রতিবেদনে ইতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ‘শিক্ষার্থীরা ভালো অগ্রগতি অর্জন করে এবং পাবলিক পরীক্ষায় জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি ফলাফল অর্জন করে।’ তাদের আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আইএসআই রিপোর্টে মন্তব্য করে, ‘শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসী এবং স্পষ্টভাষী, তা তারা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করুক বা কুরআন তিলাওয়াত করুক।’
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা ব্যবস্থাও বিশেষ প্রশংসা পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নেতৃবৃন্দ বিদ্যালয়ে একটি সুদৃঢ় সুরক্ষা সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁরা সম্ভাব্য যেকোনো সুরক্ষা ঝুঁকি বিবেচনা করেন এবং সেগুলো যতদূর সম্ভব হ্রাস করার জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সুরক্ষা ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াসমূহ সুপরিকল্পিত এবং কার্যকর, কোনো উদ্বেগ বা অভিযোগের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দ্রুত ও কার্যকরভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।’
আইএসএ (ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্কুলস অ্যাসোসিয়েশন) প্রতিষ্ঠানটিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলে, ‘অভিনন্দন! এই প্রতিবেদন একটি অসাধারণ অর্জন। আমার বিশ্বাস, আপনিই প্রথম মুসলিম বিদ্যালয়, যারা “সিগনিফিক্যান্ট স্ট্রেন্থ” স্বীকৃতি অর্জন করেছে। পরিদর্শক আপনাদের শিক্ষাক্রমের দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং শিক্ষার্থীদের ইসলামী শিক্ষা ও মূল একাডেমিক বিষয়গুলোর মধ্যে যে কার্যকর সমন্বয় বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তা স্বীকৃতি দিয়েছেন—এটি সত্যিই অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন প্রতিষ্ঠানের হেড মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা নজরুল ইসলাম, বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা জনাব কে. এম. আবু তাহের চৌধুরী, টাওয়ার হেমলেটস কাউন্সিলের ক্যাবিনেট সদস্য ও কাউন্সিলর সাঈদ আহমদ, কাউন্সিলর ফয়সল আহমদ, অভিভাবকদের পক্ষে ভিনসেন্ট মন্টি এবং হাবিবুর রহমান হারুন। এছাড়া অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। সমাপনী দোয়া পরিচালনা করেন ট্রাস্টের চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস আল্লামা আবদুল জলিল।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট উলামায়ে কেরাম, শিক্ষক, সাংবাদিক, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ও শুভানুধ্যায়ীরা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মুহাদ্দিস মাওলানা শিহাব উদ্দিন, মুফতি মাওলানা আশরাফুর রহমান, মাওলানা আব্দুল কাহহার, সৈয়দ বদরুল হুসাইন, গভর্নিং বডির সদস্য জনাব বদরুল ইসলাম, হাফিজ মাওলানা কয়েছ উজ জামান, জনাব নজরুল ইসলাম গজনবী, মাওলানা আব্দুল মালিক চৌধুরী, কাউন্সিলর মাওলানা ফয়সল আহমদ, মাওলানা অলিউর রহমান চৌধুরী দুবাগী, মাওলানা আব্দুল ওয়াসি আরিফ, মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন, মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস, মাওলানা রাফি আহমদ, কারী নোমান আহমদ, কারী সুফিয়ান বিল্লাহ, ইয়াহইয়া আহমদ, মাওলানা ইউসুফ আহমদ এবং জনাব সদরুল ইসলাম, মাওলানা আব্দুল ওয়াহিদ।
স্কুল কর্তৃপক্ষ এই অসাধারণ অর্জনের জন্য সর্বপ্রথম মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন এবং শিক্ষক, অভিভাবক, দাতা, শিক্ষার্থী ও সমগ্র স্কুল কমিউনিটির প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, এই সাফল্য দারুল হাদিস লতিফিয়াকে শিক্ষার উৎকর্ষ, ইসলামী মূল্যবোধ এবং নৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য একটি অনুকরণীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে। সম্পূর্ণ প্রতিবেদন পড়তে স্কুলের ওয়েবসাইট www.darulhadis.org.uk
এম.কে


