15.2 C
London
August 21, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ‘ধর্ষণবিরোধী’ পাঠ! ব্রিটিশ নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত

যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নারী-পুরুষের সমতা, যৌন সম্মতি, ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতন এবং জনসমক্ষে আচরণবিধি নিয়ে নতুন একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ১৯ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ‘Understanding behaviours and expectations in the UK: A guide for asylum seekers’ নামের এই নির্দেশিকায় যুক্তরাজ্যের আইন ও সামাজিক প্রত্যাশা সম্পর্কে আশ্রয়প্রার্থীদের স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে।

নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে পুরুষ ও নারীর সমান অধিকার রয়েছে এবং এটি দেশটির সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা আইন দ্বারা সুরক্ষিত। নারীরা কাজ করতে, অর্থ উপার্জন করতে, পড়াশোনা করতে, স্বাধীনভাবে ভ্রমণ করতে, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে এবং কাকে বিয়ে করবেন—সে সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন। এসব কাজের জন্য স্বামী, বাবা, ভাই কিংবা অন্য কোনো পুরুষের অনুমতির প্রয়োজন নেই।

এতে আরও বলা হয়েছে, স্বামী, বাবা বা ভাই হলেও কোনো পুরুষ নারীর কাজ বা পড়াশোনা বন্ধ করতে, তার পোশাক বা চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে, বন্ধু-পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে বাধা দিতে কিংবা তার সম্মতি ছাড়া তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক বা হুমকিমূলক আচরণ পারিবারিক নির্যাতন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এর জন্য পুলিশি ব্যবস্থা, কারাদণ্ড, আশ্রয়-সহায়তা ও আবাসন হারানো এবং আশ্রয় আবেদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার মতো পরিণতি হতে পারে।

যৌন সম্পর্ক ও সম্মতির বিষয়টিও নির্দেশিকায় বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যৌন সম্পর্ক বা যেকোনো ধরনের যৌন সংস্পর্শের ক্ষেত্রে উভয় ব্যক্তির স্বাধীন ও স্পষ্ট সম্মতি থাকতে হবে। কেউ আগে সম্মতি দিলেও পরে মত পরিবর্তন করতে পারেন। কোনো ব্যক্তি ঘুমিয়ে থাকলে, অতিরিক্ত মদ্যপ অবস্থায় থাকলে বা স্পষ্টভাবে সম্মতি জানানোর সক্ষমতা না থাকলে তিনি যৌন সম্পর্কে সম্মতি দিতে পারেন না।

নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কারও সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে সেটি ধর্ষণ। যুক্তরাজ্যে ধর্ষণ একটি গুরুতর অপরাধ এবং এর ফলে কারাদণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি আশ্রয়প্রার্থীর আবাসন ও সহায়তা হারানোর পাশাপাশি তার আশ্রয় আবেদনের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।

অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষার বিষয়েও কঠোর সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে যৌন সম্মতির বৈধ বয়স ১৬ বছর। ১৬ বছরের কম বয়সী কাউকে আইনের দৃষ্টিতে শিশু হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গুরুতর অপরাধ। এমনকি ওই ব্যক্তি সম্মতি দিলেও তা আইনসঙ্গত নয়।

জনসমক্ষে আচরণের ক্ষেত্রেও আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কাউকে উদ্দেশ করে যৌন মন্তব্য করা, শিস দেওয়া বা চুম্বনের শব্দ করা, কাউকে অনুসরণ করা কিংবা তার চলার পথ আটকে দেওয়া নিষিদ্ধ আচরণের মধ্যে রয়েছে। কারও লিঙ্গ, ধর্ম বা চেহারার কারণে তাকে মৌখিকভাবে অপমান করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

এ ছাড়া ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। কারও সম্মতি ছাড়া তার ছবি বা ভিডিও ধারণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে কারও সম্মতি ছাড়া যৌন ছবি ধারণ বা তা অন্যের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া গুরুতর অপরাধ এবং এর জন্য গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ড হতে পারে।

নির্দেশিকাটি প্রকাশের পর অবশ্য রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক শুরু হয়েছে। স্কটিশ কনজারভেটিভদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে আসা ব্যক্তিদের ধর্ষণ যে অপরাধ—এ ধরনের মৌলিক বিষয় আলাদা করে বোঝানোর প্রয়োজন কেন হচ্ছে। দলটির বিচারবিষয়ক মুখপাত্র স্টিফেন কেরের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে আগে থেকেই জানতে হবে কারা যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করছে এবং তারা কোনো তাৎক্ষণিক ঝুঁকি তৈরি করছে কি না।

স্কটিশ কনজারভেটিভদের সমালোচনায় স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি বা এসএনপির অভিবাসন ও আবাসন নীতিও উঠে এসেছে। তাদের অভিযোগ, স্কটল্যান্ডে স্থানীয় সংযোগের নিয়ম পরিবর্তনের কারণে গ্লাসগো আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য একটি বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তবে এ ধরনের রাজনৈতিক অভিযোগ এবং অভিবাসন ও অপরাধের মধ্যে সরাসরি সম্পর্কের দাবি আলাদাভাবে যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক কয়েকটি যৌন অপরাধের ঘটনাও রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ফালকার্কে এক সিরীয় আশ্রয়প্রার্থীর যৌন হামলার ঘটনায় কারাদণ্ডের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির অপরাধের ভিত্তিতে পুরো আশ্রয়প্রার্থী বা অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে একইভাবে দায়ী করা সমীচীন নয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশিকার মূল বক্তব্য হলো—এসব আইন শুধু আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নয়; যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। নতুন দেশে এসে আইন ও সামাজিক রীতিনীতি বুঝতে যাদের অসুবিধা হতে পারে, তাদের যুক্তরাজ্যের আইন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়াই নির্দেশিকাটির ঘোষিত উদ্দেশ্য।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, আইন ভঙ্গ করলে পুলিশি ব্যবস্থা, আশ্রয়-সহায়তা ও আবাসন হারানো এবং আশ্রয় আবেদনে প্রভাব পড়ার মতো গুরুতর পরিণতি হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো আশ্রয়প্রার্থী নির্যাতন বা অপরাধের শিকার হলে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা তার আশ্রয় আবেদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, নতুন নির্দেশিকাটি একদিকে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের আইন ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে; অন্যদিকে, এর প্রয়োজনীয়তা ও অভিবাসন নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে নারী-পুরুষের সমতা, যৌন সম্মতি এবং নারীর নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আলাদা করে তুলে ধরায় যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ও একীভূতকরণ নীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সূত্রঃ স্কটিশ ডেইলি এক্সপ্রেস

এম.কে

আরো পড়ুন

সামনের বছরগুলিতে যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের হার কমবেঃ মাইগ্রেশন কমিটি

ফিলিস্তিনপন্থি সংগঠন নিষিদ্ধের পক্ষে ভোট টিউলিপ-রুশানারার

যুক্তরাজ্যে টিকটক বিপ্লবঃ নতুন ই-কমার্স শক্তি হয়ে উঠছে প্ল্যাটফর্মটি