যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স একদিকে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে নতুন রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দুই দেশ ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও তাদের জাতীয় স্বার্থ সবসময় এক নয় এবং ইসরায়েলের নীতির সমালোচনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইহুদিবিদ্বেষ হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
সম্প্রতি এক রক্ষণশীল রাজনৈতিক বিশ্লেষকের সঙ্গে আলাপচারিতায় ভ্যান্স বলেন, ইসরায়েলের সমর্থকদের একটি অংশ প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থকে একই বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিটি দেশের নিজস্ব কৌশলগত লক্ষ্য, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং জাতীয় অগ্রাধিকার রয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রথম বিবেচনায় থাকা উচিত মার্কিন জনগণের স্বার্থ। কোনো মিত্র দেশের সঙ্গে সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক না কেন, সেই সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক স্বার্থ ও বাস্তববাদী কূটনীতি, অন্ধ সমর্থন নয়।
ভ্যান্সের মতে, ইসরায়েলের বিভিন্ন নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা সমালোচনা করা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক বিষয়। এসব সমালোচনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইহুদিবিদ্বেষ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যায়।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কিছু ক্ষেত্রে ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য সত্যিই ইহুদিবিদ্বেষের রূপ নিতে পারে। ফলে রাজনৈতিক সমালোচনা এবং ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট। সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে লুসার্ন হ্রদের তীরে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি কূটনৈতিক অগ্রগতির জন্য পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ভূমিকাকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেন।
সেখানে দেওয়া বক্তব্যে ভ্যান্স বলেন, “আমার জীবনে দুজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আছেন—একজন ভারতীয় এবং একজন পাকিস্তানি। ভারতীয় ব্যক্তি হলেন আমার স্ত্রী উষা ভ্যান্স এবং পাকিস্তানি ব্যক্তি হলেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।”
তিনি আরও জানান, গত তিন মাসে অন্য যেকোনো ব্যক্তির তুলনায় আসিম মুনিরের সঙ্গেই তার সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ হয়েছে।
ভ্যান্স বলেন, “তার রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা ছাড়া আমি আজ এখানে থাকতে পারতাম না। তিনি শুধু একজন দক্ষ সামরিক নেতা নন, বরং একজন অসাধারণ কূটনীতিক এবং অনন্য নেতৃত্বগুণসম্পন্ন ব্যক্তি।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য পাকিস্তানের প্রতি ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত আগ্রহ এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট মোকাবিলায় ইসলামাবাদের মধ্যস্থতামূলক ভূমিকাকে নতুনভাবে মূল্যায়নের ইঙ্গিত বহন করে।
আলোচনায় ভ্যান্স আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার লক্ষ্য কেবল একটি সংকট নিরসন নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করা।
তার ভাষায়, “প্রশ্ন হলো আমরা কি একসঙ্গে নতুন একটি অধ্যায় শুরু করতে পারব? আমরা কি মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্কগুলোকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করতে পারব, নাকি আবার পুরোনো সংঘাতময় বাস্তবতায় ফিরে যাব?”
বর্তমানে গাজা যুদ্ধ, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের মধ্যেই ইসরায়েলকে সমর্থনের মাত্রা, সামরিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নীতি নিয়ে মতপার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জে ডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক বক্তব্য শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক নয়, বরং ওয়াশিংটনের ভবিষ্যৎ মধ্যপ্রাচ্য নীতির দিকনির্দেশনা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। বিশেষ করে তিনি যখন একদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছেন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বতন্ত্র জাতীয় স্বার্থ ও সমালোচনার গণতান্ত্রিক অধিকারকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তখন তা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, আগামী মাসগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতি তীব্রতর হলে ইসরায়েল, ইরান, পাকিস্তান ও আঞ্চলিক কূটনীতি নিয়ে জে ডি ভ্যান্সের অবস্থান আন্তর্জাতিক আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।
সূত্রঃ এনডিটিভি
এম.কে

