26.8 C
London
June 25, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ইংল্যান্ডে কারাগার সংকটঃ সেপ্টেম্বর থেকে আগাম মুক্তি পেতে পারেন খুনি-ধর্ষকসহ ৬ হাজার বন্দি

ইংল্যান্ডের কারাগারগুলোতে চরম স্থানসংকট মোকাবিলায় খুনি, ধর্ষক এবং যৌন অপরাধীদেরও আগাম মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ধাপে ধাপে প্রায় ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। সরকারের এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং ভুক্তভোগীদের অধিকারকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

ব্রিটিশ বিচারমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি কারাগারে ধারণক্ষমতার সংকট কাটাতে সাজা কার্যকরের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছেন। নতুন ব্যবস্থার আওতায় গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত অনেক বন্দি বর্তমানের তুলনায় অনেক আগেই মুক্তি পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, ম্যানস্লটার (অনিচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড), ধর্ষণ, গুরুতর শারীরিক আঘাত (GBH) এবং বিভিন্ন যৌন অপরাধে দণ্ডিত বন্দিরা বর্তমানে সাজাভোগের দুই-তৃতীয়াংশ শেষ করার পর মুক্তির সুযোগ পান। নতুন ব্যবস্থায় তারা অর্ধেক সাজা ভোগ করার পরই মুক্তির জন্য বিবেচিত হবেন, যদি কারাগারে তাদের আচরণ সন্তোষজনক হয় এবং তারা কোনো গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ না করেন।

উদাহরণস্বরূপ, ধর্ষণ বা ম্যানস্লটারের দায়ে ১৫ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি বর্তমানে ১০ বছর কারাভোগের পর মুক্তির সুযোগ পান। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তিনি সাড়ে ৭ বছর পরই মুক্তি পেতে পারেন।

অন্যদিকে চুরি, ডাকাতি, হামলা ও বারবার দোকান থেকে চুরির মতো অপরাধে দণ্ডিত বন্দিরা বর্তমানে সাজাভোগের ৪০ শতাংশ শেষে মুক্তি পান। নতুন ব্যবস্থায় তাদের সাজাভোগের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সম্পন্ন হলেই মুক্তি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম ধাপে প্রায় ৭০০ বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে। এরপর পরবর্তী নয় মাসে একই ধরনের ধাপে ধাপে মুক্তি কার্যক্রম চালানো হবে। বিচার মন্ত্রণালয় মোট সংখ্যা প্রকাশ না করলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, প্রায় ৬ হাজার বন্দি এই সুবিধার আওতায় আসতে পারেন।

তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রিজন গভর্নরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি টম হুইটলি সতর্ক করে বলেছেন, বহু ভুক্তভোগী তাদের মামলার অপরাধীদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই মুক্তি পাওয়ার খবর শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন। তিনি বলেন, অনেকেই ভেবেছিলেন অপরাধীরা আরও বহু বছর কারাগারে থাকবে, কিন্তু এখন তারা কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে মুক্তি পেতে পারে।

বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া বিচারমন্ত্রী নিক টিমোথি সরকারের এই পদক্ষেপকে “বেপরোয়া” এবং “ভুক্তভোগীদের প্রতি অপমান” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, খুনি ও ধর্ষকদের আগাম মুক্তি জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াবে।

অন্যদিকে সরকার বলছে, তারা একটি গুরুতর সংকটাপন্ন কারাগার ব্যবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। কারাগারগুলো প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় নতুন বন্দিদের রাখার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সরকার সতর্ক করেছে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত যেখানে আদালতে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের কারাগারে পাঠানোই সম্ভব হতো না।

সমালোচনার জবাবে সরকার কয়েকটি অতিরিক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাও ঘোষণা করেছে। কারাগারে গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য অতিরিক্ত সাজা বৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমা ৪২ দিন থেকে বাড়িয়ে ৮৪ দিন করা হয়েছে। ফলে কারাগারে খারাপ আচরণ করলে মুক্তি আরও পিছিয়ে যেতে পারে।

এ ছাড়া আগাম মুক্তিপ্রাপ্ত প্রায় সব বন্দিকে জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইসের আওতায় আনা হবে। তাদের ওপর কারফিউ, নির্দিষ্ট এলাকায় যাতায়াতের নিষেধাজ্ঞা এবং নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা থাকবে। কারাগার ত্যাগের আগেই তাদের ট্যাগিং সম্পন্ন করার জন্য পরীক্ষামূলক কর্মসূচিও চালু করা হচ্ছে।

সরকারের দাবি, এই সংস্কার যুক্তরাজ্যের সাজা ব্যবস্থার গত অর্ধশতকের অন্যতম বড় পরিবর্তন। এটি আংশিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের কারাগার সংস্কার মডেল দ্বারা অনুপ্রাণিত, যেখানে বন্দিদের ভালো আচরণ ও পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ভিত্তিতে আগাম মুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়।

কারামন্ত্রী লর্ড টিম্পসন বলেছেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু কারাগারের স্থানসংকট দূর করা নয়; বরং বন্দিদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে জননিরাপত্তা শক্তিশালী করা।

তবে সমালোচকদের মতে, খুনি, ধর্ষক ও যৌন অপরাধীদের আগাম মুক্তির মতো সিদ্ধান্ত জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করবে এবং এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

ইউরোপে সবুজ জমি হারানোর দৌড়ে যুক্তরাজ্য পঞ্চম স্থানে

রুয়ান্ডা প্রকল্পের অর্থ দিয়ে নজরদারি সরঞ্জাম কিনবে যুক্তরাজ্য

ব্রিটে‌নে ভিসার নিয়‌মে ফের পরিবর্তন