ইংল্যান্ডে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বাসে বিনামূল্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনছে সরকার। আগামী ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে প্রতিবন্ধী বাস পাসধারীরা দিনের যেকোনো সময়ে বিনামূল্যে বাসে যাতায়াত করতে পারবেন। বর্তমানে কর্মদিবসে যে সময়সীমার কারণে অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন, নতুন ব্যবস্থায় তা তুলে দেওয়া হবে।
বর্তমানে ইংল্যান্ডে প্রতিবন্ধী বাস পাস সাধারণত সোমবার থেকে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। ফলে নির্ধারিত সময়ের আগে কাজে যেতে কিংবা রাত ১১টার পর বাড়ি ফিরতে হলে অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে নিজস্ব অর্থে যাতায়াত করতে হয়। সপ্তাহান্ত ও সরকারি ছুটির দিনে অবশ্য এই সময়সীমা কার্যকর নয়।
সরকারের হিসাবে, নতুন সিদ্ধান্তে প্রায় ১০ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হতে পারেন। সরকারের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ বাড়ানোও এই সিদ্ধান্তের অন্যতম লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, দিনের নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বাস পাস ব্যবহার করতে না পারার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। তার ভাষায়, প্রতিবন্ধী মানুষের চলাচলের সুযোগ এমনভাবে সীমিত থাকা উচিত নয়, যাতে তারা কাজ, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজে যেতে বাধাগ্রস্ত হন।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এর আগে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র থাকাকালে ওই অঞ্চলে প্রতিবন্ধী বাস পাস ব্যবহারের সময়সীমা তুলে দিয়েছিলেন। সেখানে ‘বি নেটওয়ার্ক’ বাস ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা দিনের যেকোনো সময়ে পাস ব্যবহার করতে পারছেন। এবার একই সুবিধা পুরো ইংল্যান্ডে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবন্ধী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। স্কোপ বলেছে, এই পরিবর্তন প্রতিবন্ধী মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন বাধা দূর করতে সহায়তা করবে। ট্রান্সপোর্ট ফর অল-এর জেমস বারবারও সিদ্ধান্তটিকে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু সময়সীমা তুলে দিলেই সব সমস্যা সমাধান হবে না। প্রতিবন্ধী বাস পাস পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যে ভিন্নতা রয়েছে, সেটিও দূর করতে হবে। প্রতিবন্ধী অধিকার ইউকের মতে, পুরো ব্যবস্থাকে আরও অভিন্ন ও ন্যায়সংগত করতে সরকারকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হবে।
শেফিল্ডের নিবন্ধিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কার্টিস ক্রসথর্ন বলেছেন, নতুন ব্যবস্থা প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে স্বস্তি তৈরি করবে। তার মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও কর্মস্থলে যেতে হয় এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে হয়। বিশেষ করে যারা গাড়ি চালাতে পারেন না, তাদের জন্য বাস শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অবলম্বন।
নতুন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ৬ কোটি পাউন্ড। পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং কর্মসংস্থান ও পেনশন মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে এই অর্থ দেওয়া হবে। কর্মসংস্থান ও পেনশনবিষয়ক মন্ত্রী লিলিয়ান গ্রিনউড জানিয়েছেন, এটি স্বল্পমেয়াদি কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং সরকারের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি। ভবিষ্যতে ব্যয়ের অর্থ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা সরকারি ব্যয় পর্যালোচনার সময় বিবেচনা করা হবে।
জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে সরকার এরই মধ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য আগস্ট মাসে বিনামূল্যে বাসযাত্রার সুবিধা চালু করেছে। পাশাপাশি একক বাস টিকিটের ভাড়া সর্বোচ্চ ২ পাউন্ডে রাখার ব্যবস্থাতেও বাস কোম্পানিগুলোকে অংশ নিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের অন্যান্য অংশে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিনামূল্যে বাসযাত্রার ব্যবস্থা আগেই চালু রয়েছে। স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বিনামূল্যে বাসে যাতায়াত করতে পারেন। উত্তর আয়ারল্যান্ডে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও যুদ্ধাহত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিনামূল্যে যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে; অন্য প্রতিবন্ধী বাস পাসধারীরা অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত করতে পারেন।
নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ইংল্যান্ডে প্রতিবন্ধী মানুষের কর্মস্থলে যাতায়াত, চিকিৎসা, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে চলাচল আরও সহজ হবে। সরকারের প্রত্যাশা, যাতায়াতের এই বাধা কমলে প্রতিবন্ধী মানুষের কর্মসংস্থান ও সামাজিক অংশগ্রহণও বাড়বে।
তবে অধিকারকর্মীদের দাবি, এটি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও আরও বড় সংস্কার প্রয়োজন। সময়সীমা তুলে দেওয়ার পাশাপাশি বাস পাস পাওয়ার যোগ্যতা, আবেদন প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে থাকা বৈষম্য দূর করা গেলে ইংল্যান্ডের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি আরও কার্যকর ও সমতাভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

