ইউরোপের একাধিক দেশে সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও ফ্রিজারে সন্দেহজনক সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে শীতলীকরণ ব্যবস্থা, বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তাপমাত্রা। ফলে নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ তাজা, হিমায়িত ও সংরক্ষিত খাদ্যসামগ্রী। এই ঘটনায় ইউরোপের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেলজিয়াম, সুইডেন, লুক্সেমবার্গ, আয়ারল্যান্ড, এস্তোনিয়া, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের বিভিন্ন সুপারমার্কেটে শীতলীকরণ ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা গেছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা রাতারাতি বেড়ে যাওয়ায় খাবার সরিয়ে ফেলতে এবং কিছু দোকান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গে ডেলহাইজের প্রায় ৪০টি সুপারমার্কেট আক্রান্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বেলজিয়ামে ক্যারিফোরের ১৫টি দোকানেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। সুইডেনের আইসিএ ও কোপের কয়েকটি শাখা এবং আয়ারল্যান্ডের সুপারভ্যালুর ১৩টি দোকানেও শীতলীকরণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সুইডেনের একটি আইসিএ দোকান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, তাদের ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা সাইবার হামলার মাধ্যমে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট হয়ে যায়। দোকানটি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও পরে আবার চালু করা হয়েছে। সুইডেনের কোপ জানিয়েছে, তাদের আক্রান্ত দোকানগুলোর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
আধুনিক সুপারমার্কেটগুলোতে ফ্রিজ, ফ্রিজার ও শীতলীকরণ যন্ত্রের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূর থেকেই এসব যন্ত্র পর্যবেক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সাইবার অপরাধীরা এসব ব্যবস্থার নিরাপত্তাগত দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় প্রবেশ করছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এরপর ফ্রিজারের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া, শীতলীকরণ ব্যবস্থা বন্ধ করা কিংবা ডিফ্রস্ট কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করার মতো পরিবর্তন ঘটানো হচ্ছে।
এতে সংরক্ষিত মাংস, মাছ, দুধ, দুগ্ধজাত খাবার ও হিমায়িত পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শীতলীকরণ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ায় দোকান বন্ধ রাখতে হচ্ছে এবং বিক্রির জন্য রাখা খাবার ফেলে দিতে হচ্ছে।
ইউরোপে এই ঘটনা নতুন নয়। গত অক্টোবর মাসে ফ্রান্সের শত শত সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও ফ্রিজারে একই ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটে। তখন হ্যাকাররা শীতলীকরণ যন্ত্রের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় প্রবেশ করে খাবার নষ্ট করে দেয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ফ্রান্সের বিভিন্ন সুপারমার্কেটে হিমায়িত ও তাজা খাবার নষ্ট হওয়ায় কয়েক মিলিয়ন ইউরোর ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। দেশটির একাধিক বড় সুপারমার্কেট প্রতিষ্ঠান এই হামলার শিকার হয়।
ফ্রান্সের ঘটনার পর এবার ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে একই ধরনের হামলার ঘটনা সামনে এসেছে। তবে ফ্রান্সের আগের হামলার সঙ্গে সাম্প্রতিক হামলাগুলোর সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও ফ্রিজার শুধু খাবার সংরক্ষণের যন্ত্র নয়, আধুনিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ব্যবস্থায় সাইবার হামলা হলে খাবারের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষতি, সরবরাহে বিঘ্ন এবং খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত ইউরোপজুড়ে ব্যাপক খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে, এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। আক্রান্ত দোকানগুলোর অনেকেই দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো ঘটনাগুলো তদন্ত করছে এবং শীতলীকরণ ব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নিচ্ছে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোর দায় এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা সংগঠন স্বীকার করেনি। হামলাকারীদের পরিচয় এবং তাদের উদ্দেশ্যও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
ইউরোপের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেট-সংযুক্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থার নিরাপত্তা দুর্বলতা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পুরোনো প্রযুক্তি, নিরাপত্তা হালনাগাদের অভাব এবং দূরবর্তী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এসব হামলার সুযোগ তৈরি করছে।
একটি সুপারমার্কেটের ফ্রিজার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় সাইবার হামলা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট করা সম্ভব হওয়ায় ঘটনাটি ইউরোপের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সূত্রঃ বিবিসি, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, দ্য গার্ডিয়ান
এমকে

