সাইপ্রাসে ২০২৬ সালের প্রথম পশ্চিম নীল ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত ৭৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তি বর্তমানে নিকোসিয়া জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তার মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা গুরুতর হলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা গেছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই ব্যক্তির সাম্প্রতিক কোনো বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস নেই। ফলে তিনি সাইপ্রাসের স্থানীয় কোনো সংক্রমিত মশার কামড়েই আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি কোথায় ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, তা খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরু হয়েছে। সংক্রমণের সম্ভাব্য এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পশ্চিম নীল ভাইরাস মূলত সংক্রমিত মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। মশা সাধারণত আক্রান্ত পাখি থেকে ভাইরাসটি গ্রহণ করে এবং পরে মানুষ বা অন্য প্রাণীকে কামড়ানোর মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিতে পারে। সাধারণ স্পর্শ, কাশি, হাঁচি বা একই জায়গায় অবস্থানের মাধ্যমে একজন মানুষ থেকে আরেকজনের শরীরে এই ভাইরাস ছড়ায় না।
ভাইরাসে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষের কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। কারও কারও ক্ষেত্রে জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, শরীর ব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি কিংবা ত্বকে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। তবে এক শতাংশেরও কম আক্রান্তের ক্ষেত্রে ভাইরাসটি স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। তখন এনসেফালাইটিস, মেনিনজাইটিস বা অন্যান্য গুরুতর স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বয়স্ক ব্যক্তি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল এমন মানুষ এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে বর্তমানে ভাইরাসটি নির্মূল করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই; গুরুতর অবস্থায় মূলত সহায়ক চিকিৎসার মাধ্যমে জটিলতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় পশ্চিম নীল ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ায় মশা পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, আক্রান্ত এলাকায় বসবাসকারী ও ভ্রমণকারীদের মশার কামড় এড়াতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া উচিত।
সাইপ্রাসে এই সংক্রমণ এমন সময়ে শনাক্ত হলো, যখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পশ্চিম নীল ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক ইউরোপীয় তথ্য অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট পর্যন্ত নয়টি দেশে স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত ৪২৯টি মানব সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ইতালিতে ২২৪টি, গ্রিসে ১০৫টি, স্পেনে ৪২টি, উত্তর মেসিডোনিয়ায় ৩০টি এবং রোমানিয়ায় ১৮টি সংক্রমণ রয়েছে। ফ্রান্সে ছয়টি, সার্বিয়ায় দুটি এবং জার্মানি ও কসোভোয় একটি করে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
ইতালিতে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত। দেশটির ১৬টি অঞ্চলের ৪০টি এলাকায় ভাইরাসটির স্থানীয় সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। গ্রিসেও সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে এবং দেশটির আটিকা অঞ্চলে ভাইরাসের ব্যাপক বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউরোপে উষ্ণ তাপমাত্রা ও দীর্ঘায়িত গ্রীষ্ম মশাবাহিত রোগের বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ইউরোপের রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কর্মকর্তারাও সতর্ক করেছেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মশাবাহিত রোগের সংক্রমণের মৌসুম দীর্ঘ ও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
সাইপ্রাসের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নাগরিকদের সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। দীর্ঘ হাতার পোশাক ও লম্বা প্যান্ট পরা, অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার এবং দরজা-জানালায় মশা প্রতিরোধী জালি লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে মশারি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলতেও বলা হয়েছে। ফুলের টব, পানির পাত্র, পুরোনো টায়ার, নালা কিংবা অন্য কোনো স্থানে পানি জমে থাকলে তা পরিষ্কার করার পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সাইপ্রাসের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন, দেশটিতে পশ্চিম নীল ভাইরাসের বিচ্ছিন্ন সংক্রমণ অতীতেও দেখা গেছে এবং বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস না থাকায় স্থানীয়ভাবে ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে সাইপ্রাসের বিভিন্ন পৌরসভাও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করছে। পাফোসে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করার পাশাপাশি নদীর তলদেশ ও জলাশয়ে মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম চালানোর কথা জানানো হয়েছে।
ফলে সাইপ্রাসে একজনের গুরুতর সংক্রমণ এখন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও ইউরোপজুড়ে পশ্চিম নীল ভাইরাসের বাড়তে থাকা বিস্তার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের জন্য নতুন করে সতর্কবার্তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখার ওপরই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সূত্রঃ ডাব্লিউ এইচ ও
এম.কে

