TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নীরব যুদ্ধঃ ৫ বিলিয়ন ডলারের পেস্তাবাদামের বাজার দখলের লড়াই

বিশ্বজুড়ে এখন ‘সবুজ সোনা’ বা পেস্তাবাদাম নিয়ে চলছে এক চরম ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন। বর্তমান বিশ্বে পেস্তাবাদামের বাজার মূলত তিনটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তুরস্কের করায়ত্ত। এই তিন দেশ মিলে বিশ্বের মোট উৎপাদনের ৮৫ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে।

তবে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই মাল্টি বিলিয়ন ডলারের শিল্পে এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা এবং অন্যদিকে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—এই দুইয়ের চাপে পড়ে কয়েক দশকের শ্রেষ্ঠত্ব হারাতে বসেছে ইরান।

২০২৬ সালে বৈশ্বিক পেস্তাবাদামের বাজারের আকার প্রায় ৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ‘মরডোর ইন্টেলিজেন্স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩১ সাল নাগাদ এই বাজারের মূল্য ৭.০২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। বাদামজাতীয় ফসলের মধ্যে পেস্তা অনন্য। কারণ, এটি সব জলবায়ুতে জন্মায় না। ফলে এর সরবরাহ চেইন অত্যন্ত ছোট।

ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোয়াকিন ভ্যালিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের শীর্ষ পেস্তাবাদাম উৎপাদক। ২০২৫-২৬ মৌসুমে মার্কিন উৎপাদন রেকর্ড ৭ লাখ ১২ হাজার টন ছুঁয়েছে, যা বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় ৬৫ শতাংশ। ১৯৭০-এর দশকে একটি ক্ষুদ্র অংশীদার থেকে আজ তারা একচেটিয়া বাজারে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে তুর্কিরা মূলত ছোট এবং গাঢ় সবুজ রঙের ‘আন্তেপ’ পেস্তা উৎপাদনে বিশেষজ্ঞ। ২০২৪ সালে তারা ৩ লাখ ৮৫ হাজার টন উৎপাদন করলেও তাদের অধিকাংশ উৎপাদন অভ্যন্তরীণ বাকলাভা শিল্পে ব্যবহৃত হয়। ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় তাদের রপ্তানি আয় দ্বিগুণ বেড়েছে।

আর ঐতিহাসিকভাবে পেস্তার রাজা ইরান। এখানকার ‘কেরমান’ ও ‘আকবরি’ জাতের পেস্তা উচ্চ তেলের পরিমাণ ও স্বাদের জন্য অতুলনীয়। তবে ২০২৪ সালে ২ লাখ ২৫ হাজার টন উৎপাদন করলেও ২০২৬ সালে তা কমে ২ লাখ টনে নেমে এসেছে।

২০২৬ সালে এসে ইরানের পেস্তা সাম্রাজ্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন। এর পেছনে তিনটি প্রধান ‘বটলনেক’ বা প্রতিবন্ধকতা কাজ করছেঃ

লজিস্টিক সংকটঃ চলমান সংঘাতের কারণে সমুদ্রপথ এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইরানি বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনের জন্য ‘শিপিং ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম’ বা বিমা খরচ প্রায় ৩০০ শতাংশ বা তিন গুণ বেড়েছে। ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে ইরানি পেস্তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।

অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত বিপর্যয়ঃ ঘন ঘন বিদ্যুৎ-বিভ্রাট এবং সেচপাম্পের অভাবে চাষাবাদ বিঘ্নিত হচ্ছে। ইরানি কৃষকেরা প্রথাগতভাবে কম সেচ ব্যবহার করলেও এ বছর পানির অভাবে ‘ব্ল্যাঙ্ক নাট’ এবং ছোট আকারের বাদামের হার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে।

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও শ্যাডো ট্যাক্সঃ সুইফট (SWIFT) ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় লেনদেন অত্যন্ত জটিল। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বা তুরস্কের মাধ্যমে ঘুরে আসা লেনদেনে প্রতি টনে একটি নির্দিষ্ট অংশ কমিশন হিসেবে চলে যায়, যা ইরানি রপ্তানিকারকদের জন্য একপ্রকার ‘শ্যাডো ট্যাক্স’।

ইরানের পতনের সরাসরি সুবিধাভোগী যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউএসডিএর তথ্যমতে, মার্কিন পেস্তা রপ্তানি এ বছর প্রায় ৪ লাখ ২৫ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে (২০ শতাংশ বৃদ্ধি)।

১৯২৯ সালে উদ্ভিদবিজ্ঞানী উইলিয়াম ই হোয়াইটহাউস ইরান থেকে পেস্তার বীজ ক্যালিফোর্নিয়ায় নিয়ে এসেছিলেন। ১৯ মাসব্যাপী ইরান জিম্মি সংকট (১৯৭৯-৮১) থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে ইরানের পেস্তা-বাণিজ্যে বাধা দিয়ে আসছে।

১৯৮৬ সাল থেকে ইরানি পেস্তার ওপর ২৪১ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে রেখেছে ওয়াশিংটন। জার্মানি ও চীনের মতো বড় বাজারগুলো এখন ‘অ্যাফলাটক্সিন’ সংক্রমণ ও লজিস্টিক ঝুঁকি এড়াতে মার্কিন পেস্তাকেই বেছে নিচ্ছে।

তুরস্ক বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক হলেও তারা কৌশলগত কারণে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। অভিযোগ রয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে অনেক ইরানি পেস্তা প্রথমে তুরস্কে প্রবেশ করে। সেখানে সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত বা মিশ্রিত করে ‘মিডল ইস্টার্ন প্রোডাক্ট’ হিসেবে পুনরায় রপ্তানি করা হয়।

২০২৬ সালে বৈশ্বিক পেস্তার দাম দুই অঙ্কের ঘরে বৃদ্ধি পাওয়ায় তুর্কি রপ্তানিকারকদের মুনাফার হার অনেক বেড়েছে।

একটি পেস্তাবাগান তৈরি করে প্রথম সফল ফসল পেতে ৫ থেকে ৭ বছর সময় লাগে। ইরানের খামারগুলো বর্তমানে পুঁজি ও আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধুঁকছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক তাদের প্রযুক্তি ও বাজারজাতকরণে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, ইরানের এই পিছু হটা কেবল সাময়িক কোনো বিষয় নয়; বরং এটি বৈশ্বিক পেস্তা সাম্রাজ্যের এক স্থায়ী ক্ষমতার রদবদল।

ইরানের পেস্তা উৎপাদনের হার গত অর্ধশতাব্দীর মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদি দ্রুত রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন না ঘটে, তবে ডিবাই কুনাফা চকলেট থেকে শুরু করে ইউরোপের স্ন্যাকস কর্নার পর্যন্ত সবখানেই মার্কিন ও তুর্কি পেস্তার একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হবে।

এম.কে

আরো পড়ুন

বিদেশে প্রায় ৩০টি দূতাবাস-কনস্যুলেট বন্ধ করে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্রঃ রিপোর্ট

লন্ডনে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য আলোচনায় বসছে সোমবার

ভারতের মণিপুরে প্রতিবেশী দেশ থেকে ঢুকে পড়েছে ৯০০ যোদ্ধা!