25.4 C
London
August 11, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনে ক্যানসারের ‘ওষুধ’ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে পশুর কৃমিনাশকঃ বিবিসির অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য

পশুর কৃমিনাশক ও খোসপাঁচড়া চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি ওষুধকে ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে প্রচার ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ক্যানসার নিরাময়ে কার্যকারিতার নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও ফেনবেনডাজল ও আইভারমেকটিন নামের দুটি ওষুধকে ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে মানুষের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।

বিবিসির অনুসন্ধানে দক্ষিণ ওয়েলসের এক সিঁড়ি-লিফট বিক্রয়কর্মীর কাছ থেকে গোপন পরিচয়ে ফেনবেনডাজল ও আইভারমেকটিন কেনা সম্ভব হয়েছে। ওই ব্যক্তি ১০০ পাউন্ডের বিনিময়ে দুটি ওষুধ সরবরাহ করেন এবং দাবি করেন, এতে ফুসফুসের ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসা করা যায়। তার দাবি অনুযায়ী, সরবরাহ করা ওষুধ দুই থেকে তিন মাসের জন্য যথেষ্ট।

ঘটনাটি সামনে আসে রেবেকা হোল্ডারের অভিযোগের পর। তার বাবা ববের মস্তিষ্কে টিউমার ও ফুসফুসের ক্যানসার ছিল এবং চলাফেরার জন্য সহায়তার প্রয়োজন হতো। রেবেকার দাবি, তাঁর বাবার জন্য সিঁড়ি-লিফট নিয়ে কথা বলার সময় বিক্রয়কর্মী জেসন সারভার হঠাৎ কথার প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে এমন কিছু ওষুধের কথা বলেন, যা নাকি ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায় এবং মস্তিষ্কের টিউমার ছোট করতে পারে।

পরবর্তীতে বিবিসির এক প্রতিবেদক ক্যানসারে আক্রান্ত একজন আত্মীয়ের জন্য ওষুধ প্রয়োজন—এমন পরিচয়ে সারভারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখনও তিনি একই ধরনের দাবি করেন এবং ক্যানসারের বিরুদ্ধে এসব ওষুধ কার্যকর—এমন দাবিসংবলিত বিভিন্ন ভিডিওর সংযোগ দেন। সারভার নিজেই স্বীকার করেন, তিনি চিকিৎসক নন; বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া তথ্য অন্যদের জানান।

বিবিসির অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেনবেনডাজল ও আইভারমেকটিন নিয়ে অসংখ্য ভিডিও ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। এসব প্রচারণার কিছু ভিডিও হাজার থেকে শুরু করে লাখ এমনকি কোটি মানুষের কাছেও পৌঁছেছে। সেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও কথিত সাফল্যের গল্প তুলে ধরে দাবি করা হয়েছে, এসব ওষুধ ক্যানসার সারাতে পারে।

হলিউড অভিনেতা মেল গিবসনও একটি জনপ্রিয় মার্কিন পডকাস্টে দাবি করেছিলেন, ক্যানসারে আক্রান্ত তার তিন বন্ধুর ক্ষেত্রে এসব ওষুধ সফলভাবে কাজ করেছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা কারও সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প কোনো চিকিৎসার কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়।

আইভারমেকটিন যুক্তরাজ্যে প্রেসক্রিপশন ছাড়া সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা যায় না। এটি মূলত পরজীবী সংক্রমণ এবং খোসপাঁচড়ার মতো কিছু রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য আইভারমেকটিন অনুমোদিত নয়।

অন্যদিকে ফেনবেনডাজল মূলত পশুর জন্য ব্যবহৃত কৃমিনাশক ওষুধ। যুক্তরাজ্যে এটি মানুষের ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত নয়। পরীক্ষাগারে ও প্রাণীর ওপর কিছু গবেষণায় এর সম্ভাব্য ক্যানসারবিরোধী প্রভাব নিয়ে তথ্য পাওয়া গেলেও মানুষের ক্যানসার চিকিৎসায় এটি কার্যকর—এমন নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই।

ক্যানসার সহায়তা সংস্থা ম্যাকমিলান ক্যানসার সাপোর্ট জানিয়েছে, এসব ওষুধ সম্পর্কে জানতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সংস্থাটির প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা অধ্যাপক রিচার্ড সিমকক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এসব ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে বাস্তব চিকিৎসাক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তিনি ক্যানসার রোগীদের কোনো বিকল্প ওষুধ গ্রহণের আগে নিজেদের চিকিৎসা দলের সঙ্গে পরামর্শ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ক্যানসার রিসার্চ ইউকেও সতর্ক করেছে। সংস্থাটির মতে, ফেনবেনডাজল নিয়ে ইঁদুরের ওপর কিছু গবেষণায় ক্যানসারবিরোধী সম্ভাবনার তথ্য পাওয়া গেলেও মানুষের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, এসব অপ্রমাণিত ওষুধ শুধু সরাসরি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং প্রচলিত ক্যানসার চিকিৎসাকেও ব্যাহত করতে পারে। দক্ষিণ-পশ্চিম ওয়েলস ক্যানসার কেন্দ্রের পরামর্শক ক্যানসার বিশেষজ্ঞ মার্টিন রোলস সতর্ক করে বলেছেন, এসব ওষুধ প্রচলিত ক্যানসারের ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে চিকিৎসাকে আরও বিষাক্ত করে তুলতে পারে অথবা চিকিৎসার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।

তার মতে, এসব ওষুধ খেয়ে রোগী অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্যানসারের প্রচলিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে যেতে পারে। আইভারমেকটিন নিয়ে পরীক্ষাগারে কিছু আকর্ষণীয় তথ্য পাওয়া গেলেও মানুষের ক্যানসার চিকিৎসায় কার্যকারিতা প্রমাণের মতো পর্যাপ্ত ও মানসম্মত পরীক্ষা হয়নি। একই কারণে ফেনবেনডাজলকেও ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করা নিরাপদ নয় বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনের জ্যারেড রাইট বিবিসিকে জানান, তার মা কেলি ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর আইভারমেকটিন ও ফেনবেনডাজলের ওপর আস্থা রাখেন। চিকিৎসকদের প্রচলিত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ উপেক্ষা করে তিনি অনলাইনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দিনে তিনবার এসব ওষুধ খেতে শুরু করেন।

জ্যারেডের ভাষ্য অনুযায়ী, তার মা বিশ্বাস করেছিলেন এসব ওষুধ ক্যানসার সারিয়ে দেবে। কিন্তু পরে তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। ৬৩তম জন্মদিনের কিছুদিন পর জানুয়ারিতে তার মৃত্যু হয়। জ্যারেডের দাবি, তার মা যদি সঠিক তথ্য পেতেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতেন, তাহলে হয়তো আরও দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারতেন।

বিবিসির অনুসন্ধানে যুক্তরাজ্যে এসব ওষুধ সংগ্রহ করাও তুলনামূলক সহজ বলে উঠে এসেছে। একাধিক ওয়েবসাইটে যুক্তরাজ্যের ঠিকানায় সরবরাহের সুযোগ পাওয়া যায়। এমনকি অ্যামাজনের মাধ্যমেও কয়েকটি অর্ডার সফলভাবে করা হয়। অ্যামাজন জানিয়েছে, তাদের নীতিমালা লঙ্ঘনকারী পণ্য সরানোর জন্য তারা ব্যবস্থা নিয়েছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তবে বিবিসি পরে নতুন কিছু তালিকাতেও আইভারমেকটিন ও ফেনবেনডাজল বিক্রির তথ্য দেখতে পায়।

যুক্তরাজ্যের মানব-ব্যবহারের ওষুধসংক্রান্ত আইনে যথাযথ অনুমোদন ছাড়া প্রেসক্রিপশন-নির্ভর ওষুধ সরবরাহ করা অপরাধ। যুক্তরাজ্যের ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা পণ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, কোনো পশুচিকিৎসার ওষুধ মানুষের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হলে কিংবা যোগ্য স্বাস্থ্যকর্মী ছাড়া প্রেসক্রিপশন-নির্ভর ওষুধ বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে তারা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে তারা মানুষের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে আনা ২৭ হাজার ৫০০ ডোজ ফেনবেনডাজল এবং ১ লাখ ২৪ হাজার ডোজ আইভারমেকটিন জব্দ করেছে।

তিনবার ক্যানসার জয় করা এবং সাবেক শল্যচিকিৎসক লিজ ও’রিওর্ডানও এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও কথিত সাফল্যের গল্প অনেক সময় মানুষের কাছে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের চেয়েও বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে। অথচ রোগীর প্রকৃত চিকিৎসা ইতিহাস, একই সময়ে অন্য কোনো চিকিৎসা নেওয়া হয়েছিল কি না কিংবা মৃত্যুর কারণ—এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসারের মতো জীবন-ঝুঁকিপূর্ণ রোগে রোগীদের ভয়, হতাশা ও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে অপ্রমাণিত চিকিৎসার প্রচারণা চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। কোনো ওষুধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে কিংবা কারও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় কার্যকর হয়েছে—এটিকে ক্যানসার চিকিৎসায় তার কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

বিবিসি সারভারকে এসব ওষুধ বিক্রির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অনুসন্ধানটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ক্যানসারের মতো গুরুতর রোগে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত চিকিৎসার পাশাপাশি কীভাবে অপ্রমাণিত ওষুধের প্রচারণা এত সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এবং তা ঠেকাতে অনলাইন বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কতটা কার্যকর।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ ‘পাগলামি’ :বরিস জনসন

জলবায়ু তহবিলে প্রতিশ্রুত হাজার কোটি পাউন্ড দিচ্ছে না যুক্তরাজ্য

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণ নিয়ে আইনগত সতর্কবার্তা