23 C
London
August 11, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

খরায় বিপর্যস্ত ব্রিটেনঃ কয়েক দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ খাদ্যনিরাপত্তা সংকটের আশঙ্কা

টানা খরা ও রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহে বড় ধরনের খাদ্যনিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়েছে ব্রিটেন। দেশটির কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক ধস, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের বাজার খরচেও। এমনকি বছরের শেষ নাগাদ খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মিররের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি ও অসহনীয় তাপমাত্রার কারণে ইংল্যান্ডের বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। দেশটির প্রায় ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ এলাকা বর্তমানে খরার আওতায় রয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষ খরার প্রভাবের মধ্যে পড়েছেন।

শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, সংকটের প্রভাব এখন খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপরও পড়তে শুরু করেছে। কৃষকদের অনেকের উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ শস্য, সবজি, ফল ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। ব্রিটেন সাধারণত ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ থেকে খাদ্য আমদানি করে ঘাটতি সামাল দেয়। কিন্তু এবার সেই পথও সহজ নয়। কারণ, ইউরোপের অনেক দেশও একই ধরনের চরম আবহাওয়া ও কৃষি সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।

বিনিয়োগ ব্যাংক শোর ক্যাপিটালের বিশ্লেষক আখিল প্যাটেল ও ক্লাইভ ব্ল্যাক সতর্ক করেছেন, কয়েক দশকের মধ্যে ব্রিটেন খাদ্যনিরাপত্তার এমন চ্যালেঞ্জের এতটা কাছাকাছি আর আসেনি। তাদের মতে, দেশের খাদ্য সরবরাহব্যবস্থায় নিজেদের উৎপাদনক্ষমতা কাঠামোগতভাবে বাড়ানো জরুরি।

চলমান খরা ও তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। মাঠে ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য সরবরাহেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। তীব্র গরমে ঘাসের বৃদ্ধি কমে যাওয়ায় পশুপালনকারীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। দুগ্ধ খামারগুলোতে শীতের জন্য সংরক্ষণ করা পশুখাদ্যও আগেভাগে ব্যবহার করতে হচ্ছে।

কৃষি ও উদ্যান উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, খরার কারণে যুক্তরাজ্যের দুধ উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিরিক্ত সরবরাহের পরিস্থিতি থেকে স্বল্পমেয়াদে দুধের ঘাটতির দিকে চলে গেছে বাজার।

হাউস অব লর্ডসের সদস্য এবং ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ব্যারনেস মিনেট ব্যাটার্স পরিস্থিতিকে ব্রিটিশ খাদ্যনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ২০২৬ সালের ভয়াবহ খরা সরকারকে দেশের খাদ্য সরবরাহনীতি নতুন করে বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।

তিনি সতর্ক করে বলেছেন, খরার প্রভাব যখন সুপারমার্কেটের পণ্যের দাম ও সরবরাহে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে, তখন ইতোমধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটে থাকা পরিবারগুলোর ওপর আরও চাপ তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে ব্রিটেন বৈশ্বিক সংকটের প্রভাবের প্রতি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

এর আগেও ব্রিটেনকে খাদ্য সরবরাহ সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মরক্কো ও স্পেনে ভয়াবহ আবহাওয়ার কারণে সালাদজাতীয় ফসল ও অন্যান্য সবজির সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ২০২৩ সালেও ফল ও সবজির সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা যায়। একই সময়ে উচ্চ জ্বালানি ও পশুখাদ্যের ব্যয় এবং রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণে সুপারমার্কেটগুলোতে ডিম বিক্রিতেও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে যে ধরনের চরম আবহাওয়াকে ব্যতিক্রমী মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে। ফলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। শোর ক্যাপিটালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ব্রিটেনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। জুনে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে ২০২৩ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা গিয়েছিল, সম্ভাব্য এই হার তার চেয়ে কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া, খরা ও তাপপ্রবাহ, আন্তর্জাতিক খাদ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং আমদানিনির্ভরতা—সবকিছু একসঙ্গে ব্রিটেনের খাদ্যনিরাপত্তার ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশীয় কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে।

বিশেষ করে টমেটোর মতো পণ্যে ব্রিটেনের আমদানিনির্ভরতার বিষয়টি সামনে এসেছে। বর্তমানে দেশটি স্পেন থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ টমেটো আমদানি করে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশে এসব পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামা এবং সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের খরা ব্রিটেনের জন্য শুধু পানি ও কৃষির সংকট নয়, বরং খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও বড় ধরনের চাপের বার্তা দিচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এর প্রভাব মাঠ থেকে সরাসরি সুপারমার্কেটের তাক এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের বাজারের ব্যাগে গিয়ে পড়তে পারে।

সূত্রঃ মিরর

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যের হোমঅফিসে অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণেই কি ব্যাকলগে মামলার স্তুপ

শামিমা বেগমকে ঘিরে নতুন আইনি চ্যালেঞ্জঃ ইউরোপীয় আদালতের প্রশ্নে অস্বস্তিতে যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিঃ বার্নহ্যামের প্রতি আলফ ডাবসের বার্তা