ইরানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রেয়ার আর্থ বা বিরল মাটির খনিজের সন্ধানে দেশটির সঙ্গে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা আরও জোরদার করছে চীন। চলতি বছরের যৌথ গবেষণা কর্মসূচিতে বিরল খনিজ অনুসন্ধানের পাশাপাশি এসব খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তিকেও সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
চীনের ন্যাশনাল ন্যাচারাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন এবং ইরান ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের যৌথ কর্মসূচির আওতায় এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ আধুনিক প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে রেয়ার আর্থের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌথ কর্মসূচির প্রতিটি কর্মশালার জন্য চীনের পক্ষ থেকে ৩০ হাজার ইউয়ান, যা প্রায় ৪ হাজার ২০০ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ, অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। সভা আয়োজন, আবাসন এবং অভ্যন্তরীণ যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। অন্যদিকে ইরানি ফাউন্ডেশন ইরানি গবেষকদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এবং ইরান সফরকারী চীনা গবেষকদের আবাসন ব্যয়ে সহায়তা করবে।
রেয়ার আর্থ বলতে ১৭টি ধাতুর একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে বোঝায়। এসব ধাতুর চুম্বকীয় ও বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জামে এগুলোর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান ও রাডারের মতো প্রযুক্তিতেও এসব খনিজ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বিশ্বে বিরল খনিজের বড় মজুত এবং উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতার দিক থেকে চীন সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশগুলোর একটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব খনিজ ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিদেশে সরবরাহের ওপরও বেইজিং নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের সময় চীনের রেয়ার আর্থ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছিল।
এ অবস্থায় ইরানের সম্ভাব্য রেয়ার আর্থের মজুত চীনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ইরানে ঠিক কী পরিমাণ বিরল খনিজ রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
ভূতাত্ত্বিকভাবে ইরানের কিছু এলাকায় লৌহ আকরিক ও ফসফেটের স্তর রয়েছে, যেগুলো বিরল খনিজের উপস্থিতির সম্ভাবনা তৈরি করে। মধ্য ইরানের প্রায় ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় এ ধরনের খনিজের সম্ভাব্য চিহ্ন শনাক্ত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব খনিজ বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
চীন ও ইরানের বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয় ২০১৭ সালে। এরপর দুই দেশের গবেষকরা গণিত, জীববিজ্ঞান, চিকিৎসা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করেছেন। ২০২৪ সালে দুই দেশের যৌথ কর্মশালা কর্মসূচিও শুরু হয়।
নতুন কর্মসূচিতে শুধু রেয়ার আর্থ নয়, রোগ শনাক্তকরণে ন্যানোম্যাটেরিয়াল, দূষণ পর্যবেক্ষণ, ভূমিকম্প সহনশীল নির্মাণ এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিয়েও যৌথ গবেষণার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, বিরল খনিজ অনুসন্ধান ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তিকে এই সহযোগিতার আওতায় আনা চীন-ইরান সম্পর্কের একটি নতুন মাত্রা। বিশ্বব্যাপী রেয়ার আর্থ সরবরাহ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন ইরানের সম্ভাব্য খনিজ সম্পদ নিয়ে চীনের আগ্রহ ভবিষ্যতে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও গভীর করতে পারে।
সূত্রঃ সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
এম.কে

