ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত সামরিক সহায়তা না দেওয়ায় যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ক্ষোভ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ব্রিটেনের বর্তমান সামরিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ট্রাম্পের এমন মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ফকল্যান্ড ইস্যুতে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জিবি নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের পাশে যথেষ্টভাবে দাঁড়ায়নি। তার অভিযোগ, হরমুজ প্রণালির ওপর ব্রিটেনসহ ন্যাটোভুক্ত বহু দেশের জ্বালানি নির্ভরতা থাকা সত্ত্বেও ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে ব্রিটেন পর্যাপ্ত ভূমিকা নেয়নি।
ট্রাম্প বলেন, তিনি ন্যাটোর কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলেন এবং যুক্তরাজ্যের তৎকালীন নেতৃত্বের কাছেও জানতে চেয়েছিলেন, কেন কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হয়নি। তার দাবি, ব্রিটিশ পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে তাদের কাছে প্রয়োজনীয় যুদ্ধজাহাজ নেই। ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল দেশগুলোর স্বার্থ জড়িত থাকা সত্ত্বেও ন্যাটো থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই নিজের উদ্যোগে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে।
ব্রিটেনের সমর্থনের ঘাটতি তাকে হতাশ করেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি এতে আহত হননি; বরং বিষয়টিকে একটি শিক্ষা গ্রহণের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। তবে তার বক্তব্যে যুক্তরাজ্যের সামরিক ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে।
সাক্ষাৎকারে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের বিষয়টি উঠলে পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। জিবি নিউজের উপস্থাপক বেভ টার্নার ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন, আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব নিয়ে নতুন করে দাবি তুললে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের পাশে দাঁড়াবে কি না।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ট্রাম্প বলেন, ১৯৮২ সালের যুদ্ধের সময় তিনি ঘটনাগুলো খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তার মতে, সে সময় ব্রিটেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করে দ্বীপপুঞ্জ পুনর্দখল করেছিল।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল অনেক বেশি সতর্কতামূলক। তিনি বলেন, ফকল্যান্ড ব্রিটেন থেকে অনেক দূরে এবং সেখানে সামরিক শক্তি পাঠানো একটি দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রা। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বর্তমান ব্রিটেনের সেই সক্ষমতা এখনো রয়েছে কি না।
ট্রাম্প বলেন, ব্রিটেন ২০ বা ২৫ বছর আগের মতো একই দেশ নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে ব্রিটেন যেভাবে দ্রুত ও শক্ত হাতে ফকল্যান্ড পুনর্দখল করেছিল, বর্তমানে একই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা দেশটির রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
তিনি আরও বলেন, ব্রিটেন অতীতে কোনো ধরনের ‘খেলা’ ছাড়াই দ্রুত ফকল্যান্ড পুনর্দখল করেছিল। কিন্তু এখন প্রয়োজন হলে দেশটি একইভাবে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত কি না এবং সেই সক্ষমতা তাদের রয়েছে কি না—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
ফকল্যান্ড নিয়ে সম্ভাব্য উত্তেজনা কতটা বড় আকার নিতে পারে, জানতে চাইলে বেভ টার্নার বলেন, পরিস্থিতি এখনো পরিষ্কার নয় এবং তিনি আশা করছেন কোনো সংঘাত হবে না। তবে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই কী ঘোষণা দেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ফকল্যান্ড ইস্যুর সঙ্গে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের প্রসঙ্গও সাক্ষাৎকারে উঠে আসে। বেভ টার্নার ইঙ্গিত দেন, চাগোস দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের কারণে ব্রিটেনের কৌশলগত অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়েছে কি না, সেটিও আলোচনার বিষয়।
এ বিষয়ে ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, চাগোস দ্বীপপুঞ্জ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত ছিল ভয়াবহ। তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ ওই অঞ্চল এমন পক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যাদের হাতে সেটি থাকা উচিত নয়।
ট্রাম্পের ফকল্যান্ড-সংক্রান্ত মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিনের সার্বভৌমত্বের দাবি নতুন করে সামনে আনছে। প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই ফকল্যান্ড ইস্যুকে জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে বিরোধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছেন।
এর ফলে ফকল্যান্ডকে ঘিরে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার পুরোনো বিরোধের সঙ্গে এবার যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ট্রাম্প একদিকে ব্রিটেনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, অন্যদিকে ইরান যুদ্ধে ব্রিটেনের সীমিত সহযোগিতা নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানাচ্ছেন।
ফকল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্প সরাসরি বলেননি যে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। তবে তার মন্তব্যে এটা স্পষ্ট যে তিনি ফকল্যান্ডের নিরাপত্তা, ব্রিটিশ সামরিক সক্ষমতা এবং মিত্রদের প্রতি যুক্তরাজ্যের সামরিক দায়িত্ব—এই বিষয়গুলোকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখছেন।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, ট্রাম্পের এমন বক্তব্য লন্ডনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত সতর্কবার্তা হতে পারে। কারণ ফকল্যান্ড ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবে যুক্তরাজ্যের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরে এর ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে।
একই সময়ে ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক অবস্থানের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে চলে আসায় ওয়াশিংটন-লন্ডন সম্পর্কের ওপরও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশ ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কৌশলগত মিত্র হলেও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই সম্পর্কের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি ও পারস্পরিক প্রত্যাশার প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধে ব্রিটেনের সামরিক ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভ এবং ফকল্যান্ড রক্ষায় যুক্তরাজ্যের সক্ষমতা নিয়ে তার প্রকাশ্য প্রশ্ন—দুটি বিষয়ই লন্ডনের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। আর্জেন্টিনার নতুন তৎপরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কতটা বদলায় এবং ফকল্যান্ড ইস্যুতে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনের পাশে দাঁড়ায় কি না, এখন সেটিই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠছে।
সূত্রঃ জিবি নিউজ, রয়টার্স
এম.কে

