ঢাকার সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ট্রাফিক নজরদারি ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেটের তিনটি ডিজিট ঢেকে চলাচলের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ছবি ও ভিডিওকে কেন্দ্র করে প্রায় এক সপ্তাহের তদন্ত শেষে তাকে আইনের আওতায় আনা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে দোষ স্বীকার করলে তাকে এক মাসের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) ডিএমপির আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানান, কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি-ভিডিওর মাধ্যমে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত শুরু করা হয়।
তিনি বলেন, রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চলমান প্রচেষ্টার মধ্যে এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগের কারণ হতে পারত। একজন ব্যক্তি যদি আইন ফাঁকি দিতে সফল হন, তাহলে অন্যদের মধ্যেও একই ধরনের প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই দ্রুত অভিযুক্তকে শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন ছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ভাইরাল হওয়া ছবিতে মোটরসাইকেল আরোহীর মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। ফলে তদন্ত ছিল বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। তদন্তকারীরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেন। পাশাপাশি আংশিক দৃশ্যমান নম্বরপ্লেটের তথ্যের সঙ্গে বিভিন্ন মোটরসাইকেলের নিবন্ধন নম্বর মিলিয়ে দেখা হয়।
তদন্তে অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত হন পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকার বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী লাবলু হক। তার বাবা আব্দুল হক এবং মা আনোয়ারা বেগম। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সোমবার তাকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কর্মকর্তারা জানান, নতুন ট্রাফিক ব্যবস্থার সঙ্গে নগরবাসী প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছেন। পুলিশ ধারণা করেছিল এই পরিবর্তন কার্যকর হতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগবে। কিন্তু মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই রাজধানীর সড়কে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। ঈদের ছুটিতে যানবাহনের চাপ কম থাকলেও অধিকাংশ চালককে ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলতে দেখা গেছে।
ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের উপকমিশনার রাকিব হোসেন তদন্তের বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, ভাইরাল ছবি কোথায় এবং কখন তোলা হয়েছিল সে বিষয়ে প্রথমদিকে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হয় যে ঘটনাস্থল ছিল রাজধানীর সাতরাস্তা মোড়ের বিজি প্রেসসংলগ্ন এলাকা। এরপর ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়।
তিনি জানান, নম্বরপ্লেটের তিনটি ডিজিট ইচ্ছাকৃতভাবে ঢেকে রাখা হয়েছিল। ফলে সম্ভাব্য বিভিন্ন নম্বরের সমন্বয় ধরে অনুসন্ধান চালাতে হয়। মোটরসাইকেলের রং, মডেল ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য যানবাহনের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়। পরে একে একে সংশ্লিষ্ট মোটরসাইকেলের মালিকদের তথ্য যাচাই করা হয়। ঈদের ছুটির মধ্যেও পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন ঠিকানায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করেন। একপর্যায়ে ৭০ থেকে ৮০টি মোটরসাইকেলকে তদন্তের আওতায় এনে যাচাই-বাছাই করা হয়।
রাকিব হোসেন বলেন, নম্বরপ্লেটের নকশা, মোটরসাইকেলের বৈশিষ্ট্য এবং অন্যান্য তথ্যের মিল পাওয়ার পর লাবলু হককে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেন, তেজগাঁও এলাকায় জরুরি কাজে যাওয়ার সময় তার কাছে হেলমেট ছিল না। এআইভিত্তিক ট্রাফিক নজরদারি এড়ানোর উদ্দেশ্যে তিনি নম্বরপ্লেটের তিনটি ডিজিট ঢেকে রেখেছিলেন।
পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করলে তাকে এক মাসের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা শনাক্ত করার সক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রয়েছে। তবে সড়কে দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু পুলিশের উদ্যোগ নয়, সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতাও সমানভাবে প্রয়োজন।
ডিএমপি জানিয়েছে, ট্রাফিক আইন মেনে চলতে জনগণকে উৎসাহিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তবে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে আইন ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।
সূত্রঃ স্যোশাল মিডিয়া
এম.কে

