লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসনকে ঘিরে উদ্ভূত কেলেঙ্কারিতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব গুরুতর সংকটে পড়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন প্রকাশ্যে সতর্ক করে বলেছেন, এখনই ব্যবস্থা পরিষ্কার না করলে লেবার পার্টিকে রাজনৈতিকভাবে “চড়া মূল্য” দিতে হবে।
এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ হস্তক্ষেপে গর্ডন ব্রাউন বলেন, স্টারমার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেছেন। তবে তিনি এখনো সুযোগ পাচ্ছেন—আগামী কয়েক মাসে তিনি কী করেন, তার ওপরই তার নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। ব্রাউনের ভাষায়, দুর্নীতি ও অনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছেন লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসন, যিনি গর্ডন ব্রাউনের সরকারের সময় ব্যবসা মন্ত্রী ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত জেফ্রি এপস্টিন–সংক্রান্ত নথিতে অভিযোগ ওঠে, ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় তিনি বাজার-সংবেদনশীল সরকারি নথি এপস্টিনের কাছে পাঠিয়েছিলেন। এসব তথ্য আর্থিক অপরাধ ও সরকারি দায়িত্বের গুরুতর অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।
এই অভিযোগের পর শুক্রবার রাতে মেট্রোপলিটন পুলিশ লর্ড ম্যান্ডেলসনের উত্তর লন্ডনের ক্যামডেন ও উইল্টশায়ারের দুটি বাড়িতে অভিযান চালায়। যদিও তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি, তবে সরকারি পদে অসদাচরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ম্যান্ডেলসন কেলেঙ্কারি স্যার কিয়ার স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। লেবার দলের ভেতর থেকেই তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জোরদার হচ্ছে। একাধিক ব্যাকবেঞ্চ এমপি তাকে তিন সপ্তাহ সময় দিয়েছেন, এই সময়ের মধ্যে সংকট সামাল দিতে না পারলে নেতৃত্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বিবিসি রেডিও ফোরের ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে গর্ডন ব্রাউন বলেন, স্টারমার একজন সৎ মানুষ হলেও তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে দেরি করেছেন। ব্রাউন দাবি করেন, স্টারমার ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন, তবে নেতৃত্বের জায়গা থেকে তাকে এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নিজ সরকারের সময় ম্যান্ডেলসনকে মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে অনুতাপ প্রকাশ করেন গর্ডন ব্রাউন। তিনি স্বীকার করেন, এটি ছিল একটি বড় ভুল সিদ্ধান্ত। ব্রাউনের ভাষায়, এপস্টিনের কাছে সংবেদনশীল নথি পাচার করা যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
স্টারমারের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে ব্রাউন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভেটিং প্রক্রিয়ায় মারাত্মক ব্যর্থতা ছিল। তার দাবি, স্টারমারকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে এবং বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছেন তিনি নিজেই।
এদিকে লেবার পার্টির বামপন্থী অংশ থেকে স্টারমারের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় সমালোচনা শুরু হয়েছে। এমপি কিম জনসন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্টারমারের অবস্থান “অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত”। সাবেক ছায়া অর্থমন্ত্রী জন ম্যাকডোনেল দলের ভেতরে একটি “পরিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া” শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন।
বিরোধী দলগুলোর চাপও বাড়ছে। গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কি স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করে বলেন, এই কেলেঙ্কারি রাজনীতির প্রতি জনগণের আস্থা ভেঙে দিয়েছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফসিএকে সম্ভাব্য আর্থিক অপরাধ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে, এপস্টিন নথিতে উঠে আসা নতুন তথ্য লর্ড ম্যান্ডেলসনের আগের বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নথিতে এমন প্রমাণ মিলেছে, যা থেকে বোঝা যায়—তিনি এপস্টিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন এবং তার বাড়িতে তরুণীদের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতেন।
সব মিলিয়ে ম্যান্ডেলসন কেলেঙ্কারি শুধু একটি আইনি ইস্যু নয়, বরং এটি লেবার পার্টির নৈতিক অবস্থান ও স্যার কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর বড় ধরনের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহেই স্পষ্ট হবে, এই সংকট থেকে তিনি রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে পারেন কি না।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

