TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

কোরবানির বিধিনিষেধ নিয়ে শুভেন্দু সরকারকে প্রথম চ্যালেঞ্জ দিলেন হুমায়ুন

পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নবগঠিত বিজেপি সরকারের সামনে প্রথম বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। রাজ্যে গরু জবাইয়ের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা সত্ত্বেও ঈদুল আজহায় ১ হাজার ৪০০ বছরের পুরোনো কোরবানির ঐতিহ্য বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেইউপি) প্রধান ও বিধায়ক হুমায়ুন কবীর।

অন্যদিকে, এই বিধিনিষেধকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) বিধায়ক আখরুজ্জামান। তবে এই বিতর্কের মধ্যেই বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় মুসলিম নেতা ও আলেম এ বছর মুসলমানদের গরু কোরবানি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আগামী ২৮ মে ভারতে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে।

বুধবার বার্তা সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন কবীর সাফ জানিয়ে দেন, কোনও আপত্তি বা রাষ্ট্রীয় নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে কোরবানির এই দীর্ঘদিনের রীতি অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, ‘এটি এমন এক ঐতিহ্য যা ১ হাজার ৪০০ বছর ধরে চলে আসছে এবং পৃথিবী যতদিন থাকবে, ততদিন চলবে।’

হুমায়ুন কবীর আরও জোর দিয়ে বলেন, সরকারের গরুর মাংস খাওয়ার ওপর নিয়ম আরোপের অধিকার থাকতে পারে, কিন্তু হাজার বছরের ধর্মীয় আচারে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘সরকার মুসলমানদের গরুর মাংস না খেতে নিয়ম করতে পারে, কিন্তু ধর্মীয় কোরবানি চলবেই। আমরা কোনও আপত্তি মানবো না।’

উল্লেখ্য, হুমায়ুন কবীর পূর্বে তৃণমূলের বিধায়ক এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে বাবরি মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়ার পর গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে তিনি আম জনতা উন্নয়ন পার্টি গঠন করেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি রেজিনগর ও নওদা উভয় আসনেই জয়লাভ করেন। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি বলেছিলেন, তৃণমূলকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে ঝুলন্ত বিধানসভা হলে তিনি বিজেপিকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতেও প্রস্তুত।

বিধিনিষেধের বিরোধিতায় কেবল হুমায়ুন কবীরই নন, রঘুনাথগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামানও কলকাতা হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছেন। তার দাবি, এই বিধিনিষেধ ঈদুল আজহার ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। তিনি বলেন, ‘কোরবানি ইসলামের একটি ধর্মীয় রীতি। এ সময় মানুষ নিজের লালন-পালন করা গবাদিপশু আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে।’

বুধবার আদালতে এই মামলার শুনানিতে কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র যুক্তি দেখান যে, এই প্রজ্ঞাপন পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র মানুষের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি করবে। আদালতের বেঞ্চে তিনি বলেন, ‘রাজ্য সরকারের এই নোটিশের কারণে গরিব মানুষ আর্থিক লোকসানের মুখে পড়বে। তারা কিছু সঞ্চয়ের আশায় গবাদিপশু লালন-পালন করে। রাজ্য প্রশাসনের এই পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের ক্ষতি করবে।’

একইভাবে, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী)-ও কলকাতা হাইকোর্টের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। তারা যুক্তি দিয়েছে যে, ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করার এই পদক্ষেপ মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় আঘাত হানার পাশাপাশি কৃষক ও পশু ব্যবসায়ীদের জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব ফেলবে, যাদের অনেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের। বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্ট এ সব আবেদনের ওপর রায় ঘোষণা স্থগিত রেখেছে।

হুমায়ুন কবীর যখন সরকারের সঙ্গে সংঘাতের পথে হাঁটছেন, তখন কলকাতার ঐতিহাসিক নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ শফিক কাসমি হিন্দু ভাইদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মুসলমানদের গরু কোরবানি এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। পিটিআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছাড়া রাজ্য সরকারের এই নতুন নোটিশ প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।

মাওলানা কাসমি বলেন, ‘সরকার যদি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দিতে না পারে, তবে গরুকে জাতীয় পশু ঘোষণা করে এর জবাই ও গরুর মাংস রফতানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা উচিত। সরকারকে আগে প্রতিটি এলাকায় কসাইখানা এবং প্রতি বাজারে পশু চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।’

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের হিন্দু ভাইদের অনুভূতিতে যেন আঘাত না লাগে, সেজন্য আমরা মুসলিমদের কাছে অনুরোধ করছি, দয়া করে গরু কোরবানি দেবেন না।’ এর পরিবর্তে তিনি ছাগল কোরবানির পরামর্শ দেন।

অনুরূপ আহ্বান জানিয়েছেন ফুরফুরা শরীফের পীরজাদা তোহা সিদ্দিকী। তিনি কঠোর নির্দেশিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এবার কোনও গরু কোরবানি নয়; আমি সবাইকে গরু না কেনার আহ্বান জানাচ্ছি।’

নিয়ম মেনে কোরবানি দেওয়া অত্যন্ত জটিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি এড়িয়ে চললে ঈদের সময় কোনও বিতর্ক বা অশান্তি ছড়াবে না। এর পরিবর্তে তিনি ছাগল বা অন্য বৈধ পশু কোরবানির পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে ভারতের বড় আকারের মাংস রফতানি শিল্পের সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গরুর মাংস রফতানিকারক দেশ, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?’

বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমি বিরোধ মামলার সাবেক বাদী ইকবাল আনসারিও এই বিষয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ভারতীয় মুসলিম এবং গরুকে এখানে গোমাতা বলা হয়। মুসলমানদের গরুকে সম্মান করা উচিত এবং সরকারের এটিকে জাতীয় পশু ঘোষণা করা উচিত।’

কংগ্রেস নেতা হুসাইন ডালওয়াইও হিন্দু অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘একত্রে শান্তিতে বসবাসের স্বার্থে আমাদের একে অপরের ধর্মকে শ্রদ্ধা করা উচিত এবং গরুর বদলে ছাগল কোরবানি দেওয়া উচিত।’

বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ অবশ্য বলেছেন, এই গবাদিপশু জবাইয়ের নিয়মকে ঈদের কোরবানি বা কোনও ধর্মীয় আচারের সঙ্গে মেলানো ঠিক নয়। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়াকে তিনি বলেন, ‘প্রচলিত কোনও নিয়ম থাকলে তা দেশের বিদ্যমান আইন মেনেই পালন করতে হবে।’

গত সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন এবং ২০১৮ সালের কলকাতা হাইকোর্টের একটি আদেশের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, বাধ্যতামূলক ফিটনেস সার্টিফিকেট বা ‘সুস্থতার সনদপত্র’ ছাড়া কোনও গরু বা মহিষ জবাই করা যাবে না।

এই নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পৌরসভার চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং একজন সরকারি পশু চিকিৎসক যৌথভাবে এই সনদপত্র দেবেন। তাদের লিখিতভাবে প্রত্যয়ন করতে হবে যে, পশুটির বয়স ১৪ বছরের বেশি এবং সেটি আর কাজ বা প্রজননের উপযোগী নয়, অথবা বার্ধক্য, আঘাত, বিকলাঙ্গতা বা কোনও নিরাময় অযোগ্য রোগের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কোনও পাবলিক প্লেস বা প্রকাশ্য স্থানে পশু জবাই করা যাবে না। কেবল পৌরসভা বা সরকার নির্ধারিত কসাইখানায় তা করা যাবে। এই আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, ১ হাজার রুপি পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। তবে সনদপত্র না পেলে ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারের কাছে আপিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

সূত্রঃ ইন্ডিয়া টুডে

এম.কে

আরো পড়ুন

২০২৫ হেনলি পাসপোর্ট র‌্যাঙ্কিংঃ সিঙ্গাপুর এক নম্বরে, যুক্তরাজ্য ও আমেরিকার অবস্থান নিম্নমুখী

ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের নোটিশ জারি পাকিস্তানেরঃ এএনআই’র প্রতিবেদন

হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থাঃ বৈশ্বিক তেল সরবরাহে ইতিহাসের বৃহত্তম সংকট