যুক্তরাজ্যে অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থী ইস্যুতে জনমত প্রভাবিত করতে বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা ও প্রচারক গোষ্ঠী গণমাধ্যম এবং বিনোদন জগতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলে দাবি উঠেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুতোষ টেলিভিশন অনুষ্ঠান, নাটক, সংবাদ প্রতিবেদন এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিভিন্ন মাধ্যমে ইতিবাচক অভিবাসন-বিষয়ক বয়ান প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিন ধরে সমন্বিত উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘হার্ড’ নামের একটি সংস্থা শিশুদের জন্য নির্মিত জনপ্রিয় টেলিভিশন কমেডি সিরিজ ‘পিকল স্টর্ম’-এর নির্মাতাদের সঙ্গে বৈঠক করে অভিবাসন বিষয়ে উপস্থাপনার ধরন নিয়ে আলোচনা করেছে। সংস্থাটির দাবি, শিশুদের কনটেন্টে অভিবাসনকে কীভাবে তুলে ধরা হবে, সে বিষয়ে তারা মতামত দিয়েছে এবং নির্মাতারা তা বিবেচনায় নিয়েছেন।
‘পিকল স্টর্ম’-এর গল্পে দেখা যায়, পিকল নামের এক কিশোরী ভিনগ্রহবাসী নিজ গ্রহে নিপীড়নের শিকার হয়ে একটি ব্রিটিশ শহরে আশ্রয় নেয়। সেখানে নতুন পরিবেশে তার পরিবারের মানিয়ে নেওয়ার নানা ঘটনা হাস্যরসাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসি অভিযোগ নাকচ করে জানিয়েছে, কোনো বাইরের সংস্থা তাদের অনুষ্ঠান নির্মাণ বা সম্পাদনায় প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা সম্প্রচার কার্যক্রমের একটি সাধারণ প্রক্রিয়া বলেও উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘হার্ড’ জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘করোনেশন স্ট্রিট’-এর চিত্রনাট্যকারদের সঙ্গেও আলোচনা করেছিল। পরবর্তীতে ওই ধারাবাহিকে দারিয়ান নামের এক ইরাকি আশ্রয়প্রার্থী চরিত্রকে কেন্দ্র করে কাহিনি নির্মিত হয়। যদিও সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, চরিত্রটির ধারণা তাদের নিজস্ব সৃজনশীল দলের ছিল; পরে তারা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছে।
এদিকে ‘আইমিক্স’ নামের আরেকটি দাতব্য সংস্থা সংবাদমাধ্যমে অভিবাসী ও শরণার্থীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করেছে বলে জানিয়েছে। সংস্থাটি নিজেদের লক্ষ্য হিসেবে অভিবাসন বিষয়ে সামাজিক সমর্থন বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করেছে।
তাদের দাবি, বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমে শরণার্থী ও অভিবাসীদের জীবনসংগ্রাম, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা মানুষের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন মানবিক গল্প প্রকাশে তারা সহায়তা করেছে। এসব প্রতিবেদনের মধ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের অভিজ্ঞতা, আফ্রিকান সমকামী শরণার্থীদের জীবনসংগ্রাম এবং বিতর্কিত অভিবাসন নীতির বিরোধিতাকারীদের বক্তব্যও স্থান পেয়েছে।
তবে বিবিসি জানিয়েছে, সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা পুরোপুরি বজায় রাখা হয় এবং যেকোনো প্রতিবেদন কঠোর সংবাদমান যাচাইয়ের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘কাউন্টারপয়েন্ট আর্টস’ এবং ‘পপ চেঞ্জ’ নামে বিভিন্ন উদ্যোগ জনপ্রিয় সংস্কৃতির মাধ্যমে অভিবাসন বিষয়ে ইতিবাচক ধারণা গড়ে তুলতে কাজ করছে। এসব প্রকল্পের অর্থায়নে বিভিন্ন দাতব্য তহবিল, জাতীয় লটারি, কমিক রিলিফ এবং সরকারি অনুদানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের সহায়তাও রয়েছে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী দলের ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিল্প অভিযোগ করেছেন, কিছু সংগঠন করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে অভিবাসন বিষয়ে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তার মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সরকারি অর্থায়ন পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, তারা কোনো রাজনৈতিক প্রচারণা চালায় না; বরং অভিবাসী ও শরণার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে তুলে ধরতে সাংবাদিক, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সহায়তা করে। তাদের মতে, বিভাজন নয়, বরং মানবিকতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তোলাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে অভিবাসন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিষয়টি দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ফলে গণমাধ্যম ও বিনোদন অঙ্গনে অভিবাসন বিষয়ক বয়ান গঠনে বিভিন্ন সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

