গাজা থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে যুক্তরাজ্যে আনার সর্বশেষ আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাজ্যের হোম অফিস। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মামলাটি ‘জরুরি’ নয় এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের গাজায় মায়ের সঙ্গেই থাকা বেশি উপযুক্ত।
হোম অফিসের পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, ভিসা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্ত্রী মারিমকে ভিসা আবেদন কেন্দ্র (ভিএসি)-এ গিয়ে আঙুলের ছাপ দিতে হবে—এই শর্ত স্থগিত করার মতো কোনো “যথেষ্ট জোরালো কারণ” পাওয়া যায়নি।
বাস্তবতা হলো, ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের ফলে গাজায় বর্তমানে কোনো ভিসা আবেদন কেন্দ্র নেই। ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও হামলা অব্যাহত থাকায় এসব কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে—যা হোম অফিস অবগত বলেই দাবি করেছেন বাসেম আবুদাগ্গা।
২০২২ সালে ইয়র্ক সেন্ট জন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি পড়ার জন্য বৃত্তি পেয়ে যুক্তরাজ্যে আসেন ফিলিস্তিনি একাডেমিক বাসেম আবুদাগ্গা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার চার সপ্তাহ আগে গাজা সফরে গিয়ে স্ত্রী মারিম, ছয় বছরের ছেলে কারিম ও ১০ বছরের মেয়ে তালিয়ার সঙ্গে শেষবার দেখা করেছিলেন তিনি।
ইসরায়েলি অভিযানে তাদের পারিবারিক বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে স্ত্রী ও সন্তানরা গাজার সমুদ্রতীরবর্তী একটি শরণার্থী শিবিরে তাঁবুতে বসবাস করছে। ২০২৩ সালের শরৎকাল থেকে পরিবারকে আর সরাসরি দেখেননি আবুদাগ্গা।
হোম অফিসের সিদ্ধান্ত পড়ে তিনি বলেন, তিন বছরের বেশি সময় পর পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের শেষ আশাটুকুও ভেঙে গেছে। তার ভাষায়, এটি ছিল “ভীষণ কষ্টকর” অভিজ্ঞতা।
সংবাদটি শুনে তার স্ত্রী মারিম চরম হতাশায় ভেঙে পড়েন। আবুদাগ্গার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ফোনে বলেছিলেন—যুক্তরাজ্যে নেওয়ার চেষ্টা আর না করতে, বরং পড়াশোনায় মন দিতে।
হোম অফিসের চিঠিতে আরও বলা হয়, আবুদাগ্গার পরিবারের পরিস্থিতি জাতীয় ও সীমান্ত নিরাপত্তার স্বার্থকে ছাপিয়ে যায় কি না—তা বিবেচনা করা হয়েছে। আবেদন প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, এই মানদণ্ড তারা পূরণ করে না।
এ মন্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করে আবুদাগ্গা বলেন, তার পরিবারকে যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করা এবং শিশুদের গাজায়ই ভালো আছে বলা—ব্রিটিশ মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সর্বশেষ আবেদনে তিনি অনুরোধ করেছিলেন, তার স্ত্রী ভিএসি-তে উপস্থিত হওয়ার আগেই নীতিগতভাবে ভিসা আবেদনের সিদ্ধান্ত দিতে। তাতে পররাষ্ট্র দপ্তরের সহায়তায় পরিবারকে এমন কোনো দেশে নেওয়া সম্ভব হতো, যেখানে ভিএসি চালু রয়েছে। কিন্তু সেই অনুরোধও নাকচ করা হয়।
হোম অফিস জানায়, স্বাভাবিক নীতি থেকে সরে আসার মতো পরিস্থিতি তারা দেখছে না এবং ভিএসি-তে যাওয়া নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত পরিবার পুনর্মিলন বিলম্বিত করা যেতে পারে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, আবুদাগ্গা ভবিষ্যতে গাজায় ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করায় তার যুক্তরাজ্যে অবস্থানকে অস্থায়ী ধরা হয়েছে। সে কারণে পরিস্থিতি পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত শিশুদের মায়ের কাছেই থাকা উপযুক্ত।
আইনি সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হোম অফিসের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমাতে সরকারের চাপের মধ্যেই বিশেষ করে গাজায় আটকে থাকা ফিলিস্তিনিদের অনেক আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।
আবুদাগ্গার ভাষ্য অনুযায়ী, তার স্ত্রী ও সন্তানরা তীব্র খাদ্যসংকট, শীত, ঝড়-বৃষ্টি এবং বোমাবর্ষণের স্থায়ী আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সম্প্রতি মারিম তার বাবাকে হারিয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে।
এর আগে অনুরূপ এক মামলায় আরেক পিএইচডি শিক্ষার্থী পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে যেতে সক্ষম হওয়ায় আবুদাগ্গার আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। তবে তার ক্ষেত্রে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বৈষম্যের অভিযোগ উঠছে।
আবুদাগ্গার স্থানীয় এমপি রেবেকা লং-বেইলি স্বরাষ্ট্র সচিব শাবানা মাহমুদের কাছে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানালেও হোম অফিস সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে।
এ অবস্থায় মানবাধিকার আইন সংস্থা লেই ডে-এর সহায়তায় হোম অফিসের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জের প্রস্তুতি নিয়েছেন আবুদাগ্গা। আইনজীবীদের মতে, হোম অফিসের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ীই পরিবারটির ভিসা আবেদন আগামভাবে নির্ধারণ করা উচিত ছিল।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

