চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদ পেতে ৭০ কোটি টাকার কথিত চুক্তির অভিযোগ উঠেছে প্রশাসন ক্যাডারের উপসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে। এ-সংক্রান্ত কিছু চুক্তিপত্র, ব্যাংক চেক ও ব্যক্তিগত বার্তা হাতে পাওয়ার দাবি করেছে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ডেইলি ওয়াদা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রশাসন ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা। গত বছরের শেষ দিকে তাকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলি করা হয়। এর আগে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
নথিতে দেখা যায়, গত বছরের ২৪ নভেম্বর ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা আহমেদ শাকিল খানের সঙ্গে ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি চুক্তি করেন সালাহউদ্দিন। এতে ৪ কোটি টাকা ঋণের কথা উল্লেখ ছিল। ওই অর্থের নিরাপত্তা হিসেবে তার সিটি ব্যাংক হিসাবের দুটি চেক দেওয়ার তথ্যও রয়েছে। প্রতিটি চেকের মূল্য ২ কোটি টাকা।
এর কয়েক সপ্তাহ পর, ১৭ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে সালাহউদ্দিনকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে পরিচালক পদে বদলি করা হয়। ২৩ ডিসেম্বর তিনি সেখানে যোগ দেন। তবে পরিচালকের কোনো পদ খালি না থাকায় ৮ জানুয়ারি তাকে কন্ট্রোলার অব স্টোরস পদে পদায়ন করা হয়।
এরপর সালাহউদ্দিনের সঙ্গে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির কথিত হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথন সামনে আসে। সেখানে প্রত্যাশিত পদ না পাওয়ায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তার পদায়নের ব্যবস্থা কে করেছিলেন, তা তিনি জানেন বলেও ওই কথোপকথনে ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের ডিসি পদ নিয়ে আরও নথি সামনে আসে। ২৯ মার্চের একটি লিখিত ঘোষণায় সালাহউদ্দিন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেলে দায়িত্ব পালনে তার কোনো আপত্তি নেই বলে উল্লেখ করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই নথিতে পটুয়াখালীর বাউফলের বাসিন্দা মো. হাবিবুর রহমানকে তার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগের কথাও রয়েছে।
সবচেয়ে বড় অঙ্কের তথ্য পাওয়া যায় ১৬ জুলাইয়ের একটি নথিতে। এতে সালাহউদ্দিনের কথিত স্বাক্ষরসহ চট্টগ্রামের ডিসি পদে নিয়োগের সঙ্গে ৭০ কোটি টাকার একটি চুক্তির উল্লেখ রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পদটি পাওয়ার পর ১৮ মাসের মধ্যে ‘কাজের মাধ্যমে’ ১৪০ কোটি টাকা পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছে।
তবে নথিতে ‘কাজের মাধ্যমে’ কীভাবে ১৪০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হবে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। কারা এই অর্থ পাওয়ার কথা ছিল, সেটিও স্পষ্ট নয়।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার নিরাপত্তা হিসেবে সোনালী ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের মোট ১২টি চেক দেওয়া হয়েছিল। এসব চেকের সম্মিলিত মূল্য ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের পাঁচটি চেকের মূল্য ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং সিটি ব্যাংকের সাতটি চেকের মূল্য ৫ কোটি টাকা।
সালাহউদ্দিনের সরকারি সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত চাকরির প্রোফাইল এবং তার বোন জিনিয়াত খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে সালাহউদ্দিন প্রথমে তা অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তার ফোন হ্যাক হয়েছিল, চেকগুলো হারিয়ে গিয়েছিল এবং জাতীয় পরিচয়পত্র চুরি হয়েছিল।
পরে তিনি স্বীকার করেন, সচিবালয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী কর্মকর্তাদের কাছে নিয়মিত নানা ধরনের প্রস্তাব নিয়ে যায়। এ ধরনের ঘটনা সেখানে নিয়মিত ঘটে এবং এখনো ঘটছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এসব বিষয়ে তিনি পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি বলেও জানান। তার ভাষ্য, এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল এবং ব্যবস্থা না নেওয়া তার ভুল হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া নথি থেকে অর্থের বিনিময়ে কোনো সরকারি পদ কেনাবেচা হয়েছে—এমন বিষয় নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। স্বাক্ষর করা চেক বা চুক্তি থাকলেই অর্থ লেনদেন হয়েছে এমনটাও বলা যায় না। চেকগুলো ব্যাংকে জমা বা নগদায়ন হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো ব্যাংক রেকর্ডও প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়টি ইতোমধ্যে তদন্তের আওতায় এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তের মাধ্যমে কথিত চুক্তির সত্যতা, অর্থের কোনো লেনদেন হয়েছিল কি না এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রঃ ডেইলি ওয়াদা
এম.কে

