12.5 C
London
May 16, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

ট্রাম্প-শি বৈঠকে বৈশ্বিক ক্ষমতার পালাবদলের ইঙ্গিত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল আলোচিত শীর্ষ বৈঠক ১৩মে থেকে ১৫ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

হোয়াইট হাউস ও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে শুরু হয়েছে কূটনৈতিক বিশ্লেষণ। বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক কেবল দুই পরাশক্তির আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনা নয়; বরং এটি বর্তমান বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠছে।

ওয়াশিংটন যেখানে বৈঠকটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে বেইজিং অনেক বেশি সংযত অবস্থান নিয়েছে। চীন এটিকে কোনো নাটকীয় সমঝোতা নয়, বরং বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে “যোগাযোগ ও কৌশলগত সমন্বয়” বজায় রাখার অংশ হিসেবে বর্ণনা করছে। কূটনৈতিক ভাষার এই পার্থক্য থেকেই স্পষ্ট হচ্ছে—বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র আগের তুলনায় অনেক বেশি চাপে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই চাপের মূল কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অচলাবস্থা। ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার পর পরিস্থিতি দ্রুত জটিল আকার ধারণ করে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়ে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে চীনের সহযোগিতা কামনা করছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বেইজিংকে আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তারা ইরানের ওপর নিজেদের প্রভাব ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করতে ভূমিকা রাখে।

তবে পরিস্থিতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—একদিকে ওয়াশিংটন চীনের সহযোগিতা চাইছে, অন্যদিকে প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চীনের ওপর চাপও অব্যাহত রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির এক বড় ধরনের দ্বৈত অবস্থানকে সামনে এনেছে।

ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় চীন দ্রুত সমাধান চাইবে। কিন্তু বাস্তবে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা, কৌশলগত মজুত এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুত করেছে। ফলে চীন প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক ধাক্কা এড়াতে সক্ষম হয়েছে।

এ কারণে বেইজিং এখন পরিস্থিতিকে নিজেদের কৌশলগত সুবিধা হিসেবে দেখছে। চীন ইতোমধ্যেই ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, চীন কেবল হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মতো সীমিত সমাধানে আগ্রহী নয়; বরং তারা বৃহত্তর সমঝোতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক অবস্থান থেকে সরে আসা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো মেনে নেওয়ার চাপ দিতে পারে।

এদিকে ইরান যুদ্ধ বন্ধ ও প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি প্রস্তাব পাঠালেও ট্রাম্প প্রশাসন সেটিকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে সংকট আরও গভীর হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনের সহায়তা ছাড়া কার্যকর সমাধান খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে চীনের মূল কৌশলগত অগ্রাধিকার এখনো তাইওয়ান ইস্যু। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প-শি বৈঠকে তাইওয়ান প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। চীন চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র শুধু “তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না” — এই অবস্থানে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি স্বাধীনতার বিরোধিতা করুক।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প হয়তো চীনের সহযোগিতা পাওয়ার জন্য তাইওয়ান ইস্যুতে কিছু কৌশলগত নমনীয়তা দেখানোর চেষ্টা করতে পারেন। তবে বেইজিং দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান বজায় রাখবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে জাপানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিও চীনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। টোকিও সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে এবং তাইওয়ান সংকটে ভূমিকা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে চীন চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র যেন জাপানের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সীমার মধ্যে রাখে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের একটি দায়িত্বশীল শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতেও সক্রিয় বেইজিং। চীন বারবার হরমুজ সংকট নিরসন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ওয়াশিংটনের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন ট্রাম্প-শি বৈঠক কেবল দুই নেতার রাজনৈতিক আলোচনা নয়; বরং এটি বৈশ্বিক শক্তির নতুন বাস্তবতা নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিনের মার্কিন একক আধিপত্যের বিপরীতে চীন এখন আরও আত্মবিশ্বাসী ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে বলেই আন্তর্জাতিক মহলে ধারণা তৈরি হচ্ছে।

সূত্রঃ আল জাজিরা

এম.কে

আরো পড়ুন

কোম্পানির সদর দপ্তরে ফিলিস্তিনি পতাকা উড়িয়ে যাবেন ব্রিটিশ ধনকুবের

রমজানে ইসরায়েলি খেজুর বয়কটের ডাক কলকাতার ব্যবসায়ীদের

স্প্যানিশ রিসোর্টে ব্রিটিশ কিশোরীকে ধর্ষণ, গ্রেফতার ৬ ফরাসি পর্যটক