নাশিত রহমান || লন্ডন || ১১ জুলাই ২০২৬
যুক্তরাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার জন্য আজ ডিজিটাল পরিসরকে আলাদা করে দেখা যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গ্রুপ, টেলিগ্রাম চ্যানেল, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ফেসবুক নেটওয়ার্ক—এসব এখন সরাসরি রাস্তার রাজনীতি, দাঙ্গা, বর্ণবাদী উত্তেজনা এবং নির্বাচনী আচরণকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে চরম ডানপন্থী, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও বর্ণবাদী গোষ্ঠীগুলো সংগঠিত ভুয়া তথ্য, ঘৃণামূলক প্রচারণা এবং ষড়যন্ত্রমূলক বর্ণনা ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে চাপের মুখে ফেলেছে। সাম্প্রতিক দাঙ্গা, অভিবাসনবিরোধী আন্দোলন এবং মুসলিম বিরোধী সহিংসতার পেছনে এই ডিজিটাল প্রচারণার সরাসরি প্রভাব এখন গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে আসছে।
২০২৪ সালের সাউথপোর্টের ঘটনাকে অনেক গবেষক যুক্তরাজ্যের ডিজিটাল চরমপন্থার টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন। এক কিশোরের ছুরি হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে হামলাকারী নাকি “ইসলামিস্ট মাইগ্র্যান্ট”, নৌকায় করে আসা মুসলিম আশ্রয়প্রার্থী। পরে প্রমাণিত হয়, সে ওয়েলশ, রুয়ান্ডান খ্রিস্টান পটভূমির, কিন্তু ততক্ষণে অনলাইনে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ছড়িয়ে দেয়া ভুয়া তথ্য দেশের বিভিন্ন শহরে মসজিদ, আশ্রয়কেন্দ্র ও হোটেল লক্ষ্য করে হামলা ও দাঙ্গায় রূপ নিয়েছে। এই ঘটনায় দেখা যায়, কীভাবে কয়েকটি টেলিগ্রাম চ্যানেল, এক্স এর প্রভাবশালী ফার রাইট অ্যাকাউন্ট এবং ফেসবুক গ্রুপ সমন্বিতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে জনরোষকে সহিংসতায় পরিণত করেছে।
গবেষণা দেখায়, যুক্তরাজ্যের ফার রাইট এখন আর পুরনো ধাঁচের সংগঠিত দল—যেমন BNP বা English Defence League—নির্ভর নয়; বরং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ঢিলেঢালা নেটওয়ার্ক, অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার, টেলিগ্রাম চ্যানেল এবং ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে কাজ করে। এই “পোস্ট অর্গানাইজেশনাল” কাঠামো তাদেরকে একদিকে আইনগত নজরদারি এড়াতে সাহায্য করে, অন্যদিকে দ্রুত ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে স্থানীয় ক্ষোভকে জাতীয় দাঙ্গায় পরিণত করার সুযোগ দেয়। টমি রবিনসন, অ্যান্ড্রু টেট, এবং আরও কিছু ফার রাইট ব্যক্তিত্বের অনলাইন উপস্থিতি এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে; তারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অভিবাসনবিরোধী, মুসলিম বিরোধী এবং বর্ণবাদী বর্ণনা প্রচার করে।
ডিজিটাল যুগে ভুয়া খবর, বিকৃত তথ্য এবং সংগঠিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচারণা এখন চরম ডানপন্থী, বর্ণবাদী ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র। এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সুপরিকল্পিত, তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর এবং মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে পরিচালিত এক ধরনের আধুনিক প্রচারণা যুদ্ধ। পশ্চিমা গণতন্ত্রে এই গোষ্ঠীগুলো ভুয়া তথ্যকে ব্যবহার করে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উসকে দেয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে, এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সত্যের ওপর আস্থা দুর্বল হলে গণতন্ত্রের ভিত্তি ভেঙে পড়ে—এটাই তাদের লক্ষ্য।
পশ্চিমা গণতন্ত্রে ভুল তথ্য, ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচারণা, ষড়যন্ত্রমূলক বর্ণনা এবং বিদ্বেষমূলক রাজনৈতিক বার্তা আজ এক গভীর কাঠামোগত সংকটে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা মতাদর্শগত বিভাজনের ফল নয়; বরং ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ হারানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত, রাজনৈতিক মেরুকরণ, এবং ১১ জুলাই ২০২৬ গোষ্ঠীগুলোর সংগঠিত প্রচারণার সমন্বিত প্রভাব। পশ্চিমা বিশ্বে বহু গবেষণা দেখায় যে ভুল তথ্য ও ভুয়া প্রচারণা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি এক সুসংগঠিত রাজনৈতিক কৌশল, যা সমাজকে বিভক্ত করে, রাষ্ট্রকে দুর্বল করে, এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে চরম ডানপন্থী, বর্ণবাদী ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রচারণা—যারা ভুয়া তথ্যকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্যের বিস্তার সত্য তথ্যের তুলনায় দ্রুততর। এমআইটি এর একটি গবেষণায় দেখা যায়, ভুয়া খবর সত্য খবরের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ দ্রুত ছড়ায় এবং মানুষের কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। কারণ ভুয়া খবর সাধারণত আবেগকে লক্ষ্য করে—ভয়, রাগ, ঘৃণা, সন্দেহ—যা অ্যালগরিদমকে সক্রিয় করে এবং আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো এই অ্যালগরিদমিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সংগঠিত প্রচারণা চালায়। তারা ভুয়া ভিডিও, বিকৃত তথ্য, মনগড়া পরিসংখ্যান এবং ষড়যন্ত্রমূলক বর্ণনা ব্যবহার করে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে। অভিবাসন, ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, লিঙ্গ, এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কেন্দ্র করে তারা এমন বর্ণনা তৈরি করে যা মানুষের আবেগকে উত্তেজিত করে এবং সামাজিক মেরুকরণকে গভীর করে।
পশ্চিমা বিশ্বে রাজনৈতিক প্রচারণার একটি বড় অংশ এখন “ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন”-এর ওপর নির্ভরশীল। গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের নির্বাচনের সময় ভুয়া তথ্যের ৬২ শতাংশ এসেছে সংগঠিত রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক থেকে, যার বড় অংশ শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। ইউরোপে পরিস্থিতি একই; জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং যুক্তরাজ্যে অভিবাসনবিরোধী প্রচারণার বড় অংশ ভুয়া তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে। যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণায় দেখা যায়, অভিবাসনবিরোধী প্রচারণার ৭০ শতাংশ তথ্য ছিল ভুল, বিকৃত বা প্রমাণহীন। এই প্রচারণা শুধু রাজনৈতিক সমর্থন বাড়ানোর জন্য নয়; বরং সমাজে ভয় ও সন্দেহ তৈরি করে রাজনৈতিক লাভ অর্জনের জন্য।
ফেসবুক গ্রুপগুলোকে এখন যুক্তরাজ্যে “র্যাডিকালাইজেশনের ইঞ্জিন” বলা হচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ানের একটি ডেটা ভিত্তিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, কয়েকটি বড় ফার রাইট ফেসবুক গ্রুপ শত শত হাজার ব্রিটিশ নাগরিককে প্রতিদিন বর্ণবাদী ভাষা, ষড়যন্ত্রমূলক বর্ণনা এবং ভুয়া তথ্যের মুখোমুখি করছে। এসব গ্রুপে মূলধারার রাজনীতিবিদদের “দেশদ্রোহী”, “বিশ্বাসঘাতক” বলা হয়, আদালত ও পুলিশকে “টু টিয়ার জাস্টিস” চালানোর অভিযোগ আনা হয়, এবং শরণার্থী উদ্ধারকারী সংস্থাকে “ট্যাক্সি সার্ভিস” হিসেবে অপমান করা হয়। এই ভাষা শুধু মতামত নয়; এটি এমন এক শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করে যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়।
শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর এই ভুয়া প্রচারণার রাজনৈতিক বাস্তবতা তিনটি স্তরে স্পষ্ট। প্রথমত, এটি সরাসরি রাস্তার সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। সাউথপোর্টের দাঙ্গা, এসেক্সের এপিং এ আশ্রয়কেন্দ্র ঘিরে উত্তেজনা, এবং বিভিন্ন শহরে হোটেল ও মসজিদ লক্ষ্য করে হামলার পেছনে অনলাইন ভুয়া তথ্য ও ঘৃণামূলক প্রচারণার সুস্পষ্ট ভূমিকা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এটি নির্বাচনী আচরণকে প্রভাবিত করছে। অভিবাসন, আশ্রয়প্রার্থী, মুসলিম উপস্থিতি এবং “ওয়োক পলিটিক্স” নিয়ে ভুয়া তথ্য ভোটারদের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভ তৈরি করছে, যা ফার রাইট ও পপুলিস্ট রাজনীতিকে শক্তিশালী করছে। তৃতীয়ত, এটি মূলধারার রাজনীতিকেও চাপের মুখে ফেলছে; কনজারভেটিভ ও লেবার উভয় দলই অভিবাসন ও আইন শৃঙ্খলা ইস্যুতে ক্রমশ কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, যাতে ফার রাইটের ডিজিটাল প্রচারণা তাদের ভোটব্যাংককে না টেনে নিতে পারে।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতিতেও এই বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ২০২৩ সালের National Security Act এ প্রথমবারের মতো “ফরেন ইন্টারফিয়ারেন্স” এবং অনলাইন ভুয়া প্রচারণাকে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার এখন তদন্ত করছে, সাম্প্রতিক ফার রাইট দাঙ্গায় বিদেশি রাষ্ট্র বা মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের কোনও ভূমিকা ছিল কি না—বিশেষ করে কিছু অনলাইন চ্যানেল যেগুলো রাশিয়ান মালিকানাধীন ছিল বা প্রোপাগান্ডা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল। যদিও প্রমাণ এখনো সীমিত, তবুও এই তদন্ত দেখায় যে যুক্তরাজ্য ডিজিটাল ভুয়া তথ্যকে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং হাইব্রিড ওয়ারফেয়ারের অংশ হিসেবে দেখছে।
ভুয়া তথ্যের প্রভাব সমাজে গভীর। প্রথমত, এটি সামাজিক সংহতি দুর্বল করে। যখন মানুষ ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে একে অপরকে সন্দেহ করে, তখন সমাজে বিশ্বাসের ভিত্তি ভেঙে পড়ে। অভিবাসী, সংখ্যালঘু, ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং ভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে লক্ষ্য করে চালানো প্রচারণা সমাজকে বিভক্ত করে এবং সামাজিক উত্তেজনা বাড়ায়। দ্বিতীয়ত, এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে। ভুয়া তথ্য বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রের নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যখন মানুষ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে পারে না, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তি—তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত—অকার্যকর হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রের ওপর এর প্রভাব আরও জটিল। ভুয়া তথ্য রাষ্ট্রের নীতি গ্রহণকে কঠিন করে তোলে। জনস্বাস্থ্য, অভিবাসন, অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন—এসব বিষয়ে নীতি গ্রহণের জন্য তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা অপরিহার্য। কিন্তু ভুয়া তথ্যের কারণে মানুষ বৈজ্ঞানিক সত্যকে অস্বীকার করে, নীতি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়, এবং রাষ্ট্রের ওপর জনবিশ্বাস কমে যায়। কোভিড ১৯ মহামারির সময় দেখা গেছে, ভুয়া তথ্যের কারণে টিকা গ্রহণ কমেছে, জনস্বাস্থ্য সংকট গভীর হয়েছে, এবং রাষ্ট্রের নীতি বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়েছে।
অর্থনীতির ওপর এর প্রভাবও স্পষ্ট। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ভুয়া তথ্য শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমায়, এবং বাজারে অস্থিরতা বাড়ায়। সামাজিক উত্তেজনা বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়, এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভুয়া তথ্যের বিস্তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ০.৫ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।
মানবসম্পর্কের ওপর এর প্রভাব আরও গভীর। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ভুয়া তথ্য মানুষের মানসিক স্থিতি দুর্বল করে, উদ্বেগ বাড়ায়, এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। যখন মানুষ সত্যের ওপর আস্থা হারায়, তখন তারা নিজেদের তথ্যবুদ্বুদে আটকে যায়। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী—সব সম্পর্কেই সন্দেহ ও বিভাজন তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম মানুষকে এমন তথ্য দেখায় যা তাদের পূর্বধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। ফলে সমাজে “ইকো চেম্বার” তৈরি হয়, যেখানে মানুষ শুধু নিজেদের মতাদর্শের তথ্যই দেখে এবং অন্য মতাদর্শকে শত্রু হিসেবে দেখে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। তারা এমন এক সমাজে বড় হবে যেখানে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য অস্পষ্ট, রাজনৈতিক বিভাজন গভীর, এবং সামাজিক সংহতি দুর্বল। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ভুয়া তথ্যের কারণে শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ শিক্ষার্থীরা তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা হারায়। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে; ভুল তথ্যের কারণে দক্ষতা উন্নয়ন ব্যাহত হয়, এবং শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা কমে।
শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ভুয়া তথ্য, ভুল প্রচারণা এবং বিদ্বেষমূলক রাজনৈতিক বার্তা আজ পশ্চিমা সমাজের জন্য এক গভীর সভ্যতাগত সংকট। এটি শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়; বরং সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং মানবসম্পর্ককে দুর্বল করার এক সংগঠিত প্রক্রিয়া। এই সংকট মোকাবিলায় তথ্য যাচাই, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রযুক্তি কোম্পানির জবাবদিহি, এবং নাগরিকদের তথ্য সচেতনতা অপরিহার্য। না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এমন এক সমাজে প্রবেশ করবে যেখানে সত্যের মূল্য কমে যাবে, এবং গণতন্ত্রের ভিত্তি ভেঙে পড়বে।
গণতন্ত্রের জন্য এই বাস্তবতা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। যখন শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে সমাজকে বিভক্ত করে, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উসকে দেয়, এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে “শত্রু” হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তি—বিশ্বাস, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত, এবং আইনের শাসন—দুর্বল হয়ে পড়ে। যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ডিজিটাল ভুয়া প্রচারণা আর প্রান্তিক ঘটনা নয়; এটি মূলধারার রাজনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, নীতি গ্রহণকে প্রভাবিত করছে, এবং সামাজিক সংহতিকে ভেঙে দিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে বিপজ্জনক। তারা এমন এক সমাজে বড় হবে যেখানে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য অস্পষ্ট, রাজনৈতিক বিভাজন গভীর, এবং সামাজিক সংহতি দুর্বল। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জনস্বাস্থ্য এবং নাগরিকত্ব—সব ক্ষেত্রেই তথ্য সচেতনতা ও ডিজিটাল লিটারেসি না বাড়লে তারা সহজেই ভুয়া প্রচারণার শিকার হতে পারে। যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাই আজ এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি—ডিজিটাল যুগে সত্যের ভিত্তি পুনর্গঠন না করলে গণতন্ত্র কতদিন টিকে থাকবে?

