9.9 C
London
October 22, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

নিজের টাকা ছাড়াই ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগঃ নতুন অধ্যাদেশ জারি সরকারের

বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে জারি করা হয়েছে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’। নতুন এই অধ্যাদেশের আওতায় আবাসিক বাড়ি, সরকারি-বেসরকারি ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পার্কিং এলাকা, অব্যবহৃত জমি, চা-বাগান ও জলাশয়সহ বিভিন্ন স্থানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট শর্তে গ্রাহকের নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগ ছাড়াই বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব হবে।

২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর অধ্যাদেশটির গেজেট প্রকাশ করা হয়। এতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পাশাপাশি উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যবহার, জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ, বিদ্যুৎ বিল সমন্বয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

নিজের অর্থ ছাড়াই যেভাবে বসবে সৌরবিদ্যুৎঃ

নতুন উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘ওপেক্স’ বা পরিচালন ব্যয়নির্ভর মডেল। এই ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা সার্ভিস প্রোভাইডার নিজস্ব অর্থায়নে সৌর প্যানেল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে পারবে। একই সঙ্গে ব্যবস্থাটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও নিতে পারবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।

এর বিনিময়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য বা নির্ধারিত অংশ চুক্তি অনুযায়ী পরিশোধ কিংবা সমন্বয় করা হবে। ফলে বাড়ি বা ভবনের মালিককে শুরুতেই সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পুরো ব্যয় বহন করতে হবে না।

তবে এই সুবিধা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে সৌরবিদ্যুৎ পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে স্থাপিত ব্যবস্থার বিদ্যুতের মূল্য, চুক্তির মেয়াদ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং অন্যান্য আর্থিক শর্তের ওপর গ্রাহকের প্রকৃত সুবিধা নির্ভর করবে।

যেসব স্থানে স্থাপন করা যাবে সৌরবিদ্যুৎঃ

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্তে সর্বোচ্চ পাঁচ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি ভবনের ছাদ, আবাসিক বাড়ির ছাদ ও আঙিনা, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা, বাণিজ্যিক ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পার্কিং এলাকা এবং গ্যারেজে এ ব্যবস্থা স্থাপন করা যাবে।

এ ছাড়া অব্যবহৃত জমি, চা-বাগান ও জলাশয়ে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের সুযোগও রয়েছে। কৃষিজমিতে কৃষিকাজের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ‘অ্যাগ্রিভোল্টাইক’ প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

তবে বড় আকারের ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এই বিশেষ অধ্যাদেশের আওতাভুক্ত নয়।

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কমতে পারে বিদ্যুৎ বিলঃ

নতুন অধ্যাদেশে নেট-মিটারিং ব্যবস্থার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় গ্রাহক নিজের স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি ব্যবহার করতে পারবেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তা বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে।

বিল সমন্বয়ের পরও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ অবশিষ্ট থাকলে সরকার নির্ধারিত ট্যারিফ অনুযায়ী তার মূল্য পাওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।

এর ফলে যেসব বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে দিনের বেলায় বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে প্রচলিত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। তবে কতটা বিল সাশ্রয় হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ, নিজস্ব ব্যবহার, গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ এবং প্রযোজ্য মূল্য সমন্বয়ের নিয়মের ওপর।

গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিঃ

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের ক্ষেত্রে গ্রাহক, সার্ভিস প্রোভাইডার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থাপন, পরিচালনা ও ব্যবহারের শর্ত নির্ধারণ করা হবে।

চুক্তিতে সৌর প্যানেল ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির গুণগত মান, নিরাপত্তা, বিদ্যুতের মূল্য, অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি, রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এবং স্থাপিত যন্ত্রপাতির মালিকানা স্পষ্ট করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি চুক্তির মেয়াদ, বিরোধ নিষ্পত্তি, মেয়াদ শেষে যন্ত্রপাতি ফেরত নেওয়া এবং ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে।

ফলে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নির্ধারণে চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

যন্ত্রাংশ চুরি বা ক্ষতিসাধনে কঠোর শাস্তিঃ

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অধ্যাদেশে বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুতের বিদ্যুৎ বা যন্ত্রাংশ চুরির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

অন্যদিকে, সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশের ক্ষতিসাধনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। অনুমতি ছাড়া অবৈধ সংযোগ স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট কাজে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তবে অপরাধের ধরন ও প্রযোজ্য আইনি শর্ত অনুযায়ী এসব শাস্তি কার্যকর হবে।

আগামী গ্রীষ্মের আগে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্যঃ

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী গ্রীষ্মের আগে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে।

আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ হ্রাসে সহায়তা করা এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

এ কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য জাতীয় পর্যায়ে পলিসি কাউন্সিল এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমন্বয় কমিটি গঠনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

সাধারণ মানুষের জন্য কতটা কার্যকর হবে এই উদ্যোগঃ

বাংলাদেশের বহু আবাসিক বাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ছাদ দিনের বড় একটি অংশ অব্যবহৃত থাকে। এসব ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে নতুন করে বড় জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বাড়ির মালিক ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নতুন ধরনের অংশীদারত্ব গড়ে উঠতে পারে।

তবে এ উদ্যোগের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্যতা, চুক্তির স্বচ্ছতা, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ, রক্ষণাবেক্ষণের মান এবং সাধারণ মানুষের জন্য আবেদনপ্রক্রিয়া কতটা সহজ করা হয়, তার ওপর।

বিশেষ করে নিজের অর্থ ছাড়াই সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রস্তাব গ্রহণের আগে গ্রাহকদের চুক্তির মেয়াদ, মাসিক বা ইউনিটভিত্তিক ব্যয়, যন্ত্রপাতির মালিকানা, বিদ্যুৎ বিল সমন্বয়ের পদ্ধতি এবং চুক্তি বাতিলের শর্ত ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ বাংলাদেশের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে উদ্যোগটির সফলতা নির্ভর করবে ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের স্বচ্ছতা এবং গ্রাহকরা বাস্তবে কতটা সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য সুবিধা পান, তার ওপর।

সূত্রঃ বাসস

এমকে

আরো পড়ুন

এমবিবিএস-বিডিএস ডিগ্রি ছাড়া কেউ নামের আগে ডাক্তার লিখতে পারবে নাঃ হাই কোর্ট

বাংলাদেশ হতে চীন মাত্র ২৪ ঘন্টায়ঃ চীন-মিয়ানমার হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সড়কের উদ্যোগ

বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীর যাবতীয় আপডেট পাবেন যেখানে