সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করে পশ্চিমা বিশ্বের একাকী নারী-পুরুষদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে নাইজেরিয়ার তথাকথিত ‘ইয়াহু বয়েজ’ চক্র। নিজেদের কখনও মার্কিন সেনা কর্মকর্তা, কখনও ব্যবসায়ী, আবার কখনও বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াবিদ বা তারকার পরিচয় দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আবেগঘন সম্পর্ক গড়ে তোলে তারা। এরপর নানা অজুহাতে অর্থ আদায় করা হয় ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে।
নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক কার্লোস বারাগানের অনুসন্ধান এবং তার লেখা দ্য ইয়াহু বয়েজ গ্রন্থে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ প্রতারণা চক্রের বিস্তৃত চিত্র।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০১৫ সালে। কার্লোসের মা, ৫৬ বছর বয়সী সফল দন্তচিকিৎসক সিলভিয়া বারাগান, অনলাইনে ‘ব্রায়ান’ নামের এক কথিত মার্কিন সেনা কর্মকর্তার প্রেমে পড়েন। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা যোগাযোগে ব্রায়ান নিজেকে সিরিয়ায় কর্মরত সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন এবং আবেগঘন সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
কিন্তু সন্দেহ দেখা দেয় যখন তিনি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা স্বর্ণের বার পাঠানোর গল্প শোনান। তদন্ত করে কার্লোস জানতে পারেন, সিরিয়া নয়, ওই ব্যক্তির বার্তাগুলো আসছিল নাইজেরিয়ার লাগোস থেকে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতারকদের প্রধান লক্ষ্য পশ্চিমা বিশ্বের একাকী ও মানসিকভাবে দুর্বল মানুষ।
বিশেষ করে—
মধ্যবয়সী ও বয়স্ক শ্বেতাঙ্গ নারী;
তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা নারী-পুরুষ;
একাকী অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি;
প্রেম বা সঙ্গ খুঁজতে থাকা অনলাইন ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারকারী;
সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও মানসিক সমর্থন খুঁজছেন এমন মানুষ।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি এই প্রতারণার শিকার হন।
প্রতারকরা সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ডেটিং প্ল্যাটফর্মে আকর্ষণীয় নারী বা পুরুষের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয় তৈরি করে।
এরপর তারা—
নিয়মিত খোঁজখবর নেয়;
আবেগঘন বার্তা পাঠায়;
প্রেম ও বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়;
নিজেদের বিপদে পড়া বা আর্থিক সংকটের গল্প বলে;
বিমানভাড়া, চিকিৎসা, কাস্টমস ফি, উপহার পাঠানো কিংবা জরুরি সহায়তার নামে অর্থ দাবি করে।
অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের মার্কিন সেনা কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী কিংবা জনপ্রিয় ক্রীড়াবিদ হিসেবে পরিচয় দেয়।
এক প্রতারক কয়েক বছর ধরে একজন আইরিশ নারীকে প্রতারণা করে প্রায় ৭৮ হাজার ইউরো হাতিয়ে নেয়। অন্য একজন প্রতারক ভুয়া নারী পরিচয়ে মার্কিন পুরুষদের কাছ থেকে হাজার হাজার ডলার লুট করে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই অনলাইন প্রেমের প্রতারণায় ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩০ কোটি ডলার।
মহামারির সময় একাকীত্ব বাড়ার কারণে প্রতারণার ঘটনাও বৃদ্ধি পায়। ২০২১ সালে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার এবং ২০২২ সালে তা বেড়ে এক বছরে ১৩০ কোটি ডলারে পৌঁছে যায়।
স্পেন ও ফ্রান্সেও এমন বহু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে হলিউড তারকা পরিচয়ে প্রতারণা করে লাখ লাখ ইউরো হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কার্লোস বারাগানের অনুসন্ধানে দেখা যায়, লাগোসের অধিকাংশ প্রতারক কোনো বড় আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সদস্য নয়। তারা মূলত বেকার তরুণ, যারা বন্ধুদের কাছ থেকে প্রতারণার কৌশল শিখে স্বাধীনভাবে কাজ করে। স্থানীয়ভাবে তারা ‘ইয়াহু বয়েজ’ নামে পরিচিত।
অনেকের দাবি, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, উচ্চশিক্ষার ব্যয় এবং সীমিত কর্মসংস্থানের কারণে তারা এই পথে এসেছে। তবে অধিকাংশের মধ্যেই নিজেদের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুশোচনার লক্ষণ খুব কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রতারণার মূল ভিত্তি প্রযুক্তি নয়, মানুষের আবেগ।
কার্লোস বারাগান তার অনুসন্ধানে লিখেছেন, প্রতারকরা মানুষের একাকীত্ব, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা এবং মানসিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা অর্থ হারানোর আগেই প্রতারকের প্রতি গভীর আবেগিক নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
ফলে প্রতারণার স্পষ্ট লক্ষণ সামনে থাকলেও তারা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল যুগে ক্রমবর্ধমান সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব অনলাইন প্রেমের প্রতারণাকে বৈশ্বিক অপরাধে পরিণত করেছে, যার শিকার হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

