24.2 C
London
August 23, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

পায়ে হেঁটে আবিষ্কার করুন লন্ডন শহরের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ব্রিকলেন

লন্ডন ঘোরার সবচেয়ে পরিচিত ধরন হলো বিগ বেন, লন্ডন আই, বাকিংহাম প্যালেস কিংবা টাওয়ার ব্রিজ দেখা। তবে শহরটিকে একটু অন্যভাবে উপভোগ করতে চাইলে গাড়ি বা গণপরিবহনের বদলে হাঁটতে হাঁটতে ঘুরে দেখাই হতে পারে দারুণ অভিজ্ঞতা। এতে শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, লন্ডনের ছোট রাস্তা, পুরোনো ভবন, বইয়ের দোকান, স্ট্রিট আর্ট এবং স্থানীয় সংস্কৃতিও কাছ থেকে দেখা যায়।

হাঁটার যাত্রা শুরু করা যেতে পারে ব্লুমসবেরি থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর, ঐতিহাসিক ভবন ও সাহিত্যিকদের স্মৃতির কারণে এলাকাটি লন্ডনের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ। রাস্তার বিভিন্ন ভবনে থাকা নীল ফলক দেখে জানা যায় এখানে একসময় বসবাস করেছেন বা কাজ করেছেন বিখ্যাত সব মানুষ।

ব্লুমসবেরির সঙ্গে মহাত্মা গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। একই এলাকায় ভার্জিনিয়া উল্ফ, টি. এস. এলিয়ট, পার্সি শেলি ও মেরি শেলির মতো সাহিত্যিকদের স্মৃতিচিহ্নও রয়েছে। ফলে কয়েকটি রাস্তা হাঁটলেই ইতিহাস ও সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।

ব্লুমসবেরির কাছেই রয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম। বিভিন্ন সভ্যতার ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ এই জাদুঘরের দক্ষিণ এশিয়া ও মিসরীয় সংগ্রহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কাছেই ব্রিটিশ লাইব্রেরি, যেখানে রয়েছে বিপুলসংখ্যক বই, পাণ্ডুলিপি ও ঐতিহাসিক নথি।

হাঁটার পথে পুরোনো বইয়ের দোকানেও ঢুঁ মারা যেতে পারে। ব্লুমসবেরি ও আশপাশে পুরোনো ও বিশেষায়িত বইয়ের দোকান রয়েছে। বইপ্রেমী কিংবা ইতিহাসে আগ্রহী পর্যটকদের জন্য এসব দোকান লন্ডন ভ্রমণে আলাদা আনন্দ যোগ করতে পারে।

এরপর হাঁটতে হাঁটতে যাওয়া যায় কভেন্ট গার্ডেনের দিকে। বাজার, দোকান, রেস্তোরাঁ ও ব্যস্ত রাস্তার কারণে এলাকাটি সবসময় প্রাণবন্ত। কাছেই ডেনমার্ক স্ট্রিট, যা সংগীতের যন্ত্র ও সংগীত-সংশ্লিষ্ট দোকানের জন্য পরিচিত।

ডেনমার্ক স্ট্রিট থেকে লেস্টার স্কোয়ারে পৌঁছানো যায় হেঁটেই। এখানে বড় বড় সিনেমা হল, পার্ক ও বিভিন্ন ভাস্কর্য রয়েছে। আশপাশেই লন্ডনের চিনেপাড়া—যেখানে বিভিন্ন ধরনের এশীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া যায়।

লেস্টার স্কোয়ার থেকে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাওয়া যায় ট্র্যাফলগার স্কোয়ারে। এর পাশেই রয়েছে ন্যাশনাল গ্যালারি। ইউরোপীয় চিত্রকলার বিশাল সংগ্রহের এই গ্যালারিতে ভ্যান গঘ, সেজান, মনে ও লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো বিখ্যাত শিল্পীদের কাজ দেখা যায়।

ট্র্যাফলগার স্কোয়ার থেকে টেমসের দিকে এগিয়ে গেলে হাঁটার অভিজ্ঞতা আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। নদীর পাড় ধরে সাউথ ব্যাংকের দিকে হাঁটলে একদিকে টেমস, অন্যদিকে লন্ডনের বিখ্যাত স্থাপনাগুলোর দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

সাউথ ব্যাংকে রয়েছে ন্যাশনাল থিয়েটার, ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও কুইন এলিজাবেথ হল। টেমসের অপর পাশে দেখা যায় লন্ডন আই, বিগ বেন এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টের স্থাপনা। পর্যটকদের ভিড়ের মধ্যেও নদীর পাড় ধরে হাঁটার অভিজ্ঞতা লন্ডনকে দেখার ভিন্ন সুযোগ তৈরি করে।

ওয়াটারলু ব্রিজের আশপাশে পাওয়া যেতে পারে পুরোনো বই, ছবি ও পোস্টারের বাজার। দেয়াল ও ভবনজুড়ে থাকা স্ট্রিট আর্ট ও গ্রাফিতিও হাঁটার পথে চোখে পড়বে। সাউথ ব্যাংক ধরে আরও এগিয়ে গেলে দেখা যাবে গ্লোব থিয়েটার, যা শেক্সপিয়রের নাট্যজগতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

আরও সময় থাকলে হাইড পার্ক ও সার্পেন্টাইন গ্যালারিও হাঁটার তালিকায় রাখা যায়। বিশেষ করে সমকালীন শিল্পে আগ্রহীদের জন্য সার্পেন্টাইন গ্যালারি আকর্ষণীয় একটি জায়গা।

লন্ডন ভ্রমণের এই হাঁটার যাত্রার শেষটা হতে পারে পূর্ব লন্ডনের ব্রিক লেনে। বাংলাদেশি ও অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কারণে ব্রিক লেন লন্ডনের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।

ব্রিক লেনের কাছেই আলতাব আলি পার্ক। সেখানে থাকা শহিদ মিনারের প্রতিকৃতি ব্রিটেনের বাঙালি সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও বাংলাদেশের সঙ্গে এই এলাকার সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়। অভিবাসন, বর্ণবাদ ও বৈষম্যের ইতিহাসের সঙ্গেও ব্রিক লেনের গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে।

এলাকাটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও উল্লেখযোগ্য। একটি ভবন একসময় চার্চ, পরে সিনাগগ এবং পরবর্তীতে মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—এমন ইতিহাস ব্রিক লেনের বহুসাংস্কৃতিক চরিত্রকে তুলে ধরে। রাস্তার দেয়ালজুড়ে থাকা গ্রাফিতিতে ফুটে ওঠে নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা।

হাঁটতে হাঁটতে ক্ষুধা লাগলে ব্রিক লেনের বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় খাবারের দোকানগুলো হতে পারে আকর্ষণীয় গন্তব্য। মাছের ভর্তা, চিতল মাছ, কাচ্চি বিরিয়ানি, মিষ্টি দইসহ নানা ধরনের দেশীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া যায় এখানে।

লন্ডনকে এভাবে হেঁটে দেখার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—শহরের পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি তার অজানা ও দৈনন্দিন রূপও সামনে আসে। একটি দিনের হাঁটার পরিকল্পনায় সাহিত্য, ইতিহাস, শিল্প, টেমসের সৌন্দর্য, স্ট্রিট আর্ট এবং ব্রিক লেনের বাঙালি সংস্কৃতি—সবকিছুর স্বাদ নেওয়া সম্ভব।

তাই লন্ডনে গেলে শুধু দর্শনীয় স্থান থেকে দর্শনীয় স্থানে ছুটে না গিয়ে একটি দিন রাখা যেতে পারে শহরটিকে পায়ে হেঁটে আবিষ্কার করার জন্য। কারণ হাঁটতে হাঁটতেই হয়তো কোনো পুরোনো ভবনের নীল ফলক, ছোট্ট বইয়ের দোকান, টেমসের পাড় কিংবা ব্রিক লেনের একটি বাংলাদেশি খাবারের দোকান হয়ে উঠবে পুরো ভ্রমণের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

সূত্রঃ ন্যাশনাল গ্যালারি \ ব্রিটিশ মিউজিয়াম

এম.কে

আরো পড়ুন

ব্রেক্সিটে তীব্র শ্রমিক সংকট, দুধ উৎপাদন কমছে যুক্তরাজ্যে

যুক্তরাজ্যে পার্টনার ভিসাতে আয়সীমা কমানো নিয়ে মতবিরোধে সরকার

পাবলিক ফান্ড ব্যবহারের শর্ত পরিবর্তন বা অপসারণের আবেদন কীভাবে করবেন?

নিউজ ডেস্ক