ফ্রান্সে মানবপাচারের দায়ে দণ্ডিত এক ব্যক্তি বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লেস্টারশায়ারে বসবাস করছেন এবং আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে অবস্থান করলেও অবৈধভাবে কাজ করছেন বলে দাবি করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাটি যুক্তরাজ্যের সীমান্ত নিরাপত্তা ও আশ্রয়প্রার্থীদের অতীত অপরাধ যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরাকি কুর্দি বংশোদ্ভূত টওয়ানা জামাল ২০১৬ সালে ফ্রান্সে মানবপাচারের দায়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। সে সময় ফরাসি কর্তৃপক্ষ তাকে দেশটির অভিবাসী শিবিরগুলোর অন্যতম প্রভাবশালী মানবপাচারকারী হিসেবে বর্ণনা করেছিল। প্রসিকিউটরদের দাবি ছিল, তিনি অবৈধ অভিবাসীদের ইংলিশ চ্যানেল পার করে যুক্তরাজ্যে পাঠিয়ে প্রতি সপ্তাহে এক লাখ পাউন্ড পর্যন্ত আয় করতেন।
বিবিসির দাবি, চলতি বছরে একটি গোপন সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে তারা লেস্টারশায়ারের ব্ল্যাবি এলাকায় জামালের অবস্থান শনাক্ত করে। কয়েক দিন পর্যবেক্ষণের পর সাংবাদিকেরা তাকে একটি দোকানে কাজ করতে এবং বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে দেখেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে তার কাজ করা বা বৈধ অনুমতি ছাড়া গাড়ি চালানো আইনসম্মত নয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের ডানকার্কের গ্রঁ-সিন্ত অভিবাসী শিবিরকে কেন্দ্র করে ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে জামাল মানবপাচার চক্র পরিচালনা করতেন। সে সময় ছোট নৌকার পরিবর্তে পণ্যবাহী ট্রাক ব্যবহার করে অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে পাঠানো হতো। প্রত্যেক ব্যক্তির কাছ থেকে চার হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত নেওয়া হতো বলেও আদালতে প্রসিকিউটররা দাবি করেছিলেন।
বিবিসির অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, জামাল অতীতে “পাশা”সহ একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। সাংবাদিকেরা তাকে একটি দোকানে “সুলতান” নামে পরিচয় দিতে দেখেছেন। তার হাতের ট্যাটু এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসি দাবি করেছে, দোকানে কর্মরত ব্যক্তিই ফ্রান্সে দণ্ডিত টওয়ানা জামাল।
পরে সাংবাদিকেরা তার মুখোমুখি হলে জামাল মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তিনি কখনো ফ্রান্সে কারাভোগ করেননি এবং ২০০৯ সাল থেকেই যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। তবে সাংবাদিকেরা ২০১৬ সালের আদালতের একটি ছবি দেখালে তিনি সেটিতে নিজের উপস্থিতি অস্বীকার করেননি। একই সঙ্গে দোকানে কাজ করার অভিযোগও অস্বীকার করেন, যদিও বিবিসির দাবি, তাদের কাছে তার কাজ করার পর্যবেক্ষণ ও ভিডিও প্রমাণ রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জামালের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বিবিসির অনুসন্ধানে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ২০ জনেরও বেশি সক্রিয় মানবপাচারকারীকে শনাক্ত করার দাবি করা হয়েছে। এদের মধ্যে অন্তত ১৫ জনের বিরুদ্ধে ফ্রান্স, জার্মানি ও বেলজিয়ামে অপরাধের রেকর্ড রয়েছে বলে ইউরোপের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত করেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ভুয়া পরিচয়ে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের মতে, ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য না থাকায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অপরাধসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বিদেশে দণ্ডিত ব্যক্তিদের অতীত যাচাইয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
তবে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রত্যেক আশ্রয়প্রার্থীর পরিচয়, নিরাপত্তা এবং অপরাধসংক্রান্ত বাধ্যতামূলক যাচাই করা হয়। মন্ত্রণালয়ের দাবি, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অপরাধসংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের জন্য যুক্তরাজ্যের একাধিক চুক্তি রয়েছে এবং অবৈধভাবে কাজের বিরুদ্ধে অভিযান ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা বর্তমানে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর যুক্তরাজ্যের সীমান্ত নিরাপত্তা, আশ্রয়ব্যবস্থা এবং বিদেশে দণ্ডিত ব্যক্তিদের যাচাই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

