যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড নগরীতে বন্দুক সহিংসতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক গুলির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। সর্বশেষ ঘটনায় ৩০ বছর বয়সী এক তরুণী মা বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে সময় কাটানোর সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি কোনো অপরাধী চক্রের সদস্য ছিলেন না; বরং ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক নিরীহ পথচারী হিসেবে প্রাণ হারান।
এই হত্যাকাণ্ডের পর শেফিল্ডজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মাদক ব্যবসা, গ্যাং সংঘাত এবং এলাকা নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে বন্দুকের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। অনেকের মতে, অপরাধীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছে যাওয়া এখন আগের তুলনায় সহজ হয়ে গেছে।
কয়েক মাস আগে পরিচালিত এক বড় অভিযানে পুলিশ একটি অবৈধ অস্ত্র তৈরির নেটওয়ার্কের সন্ধান পায়। অভিযানে শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয় এবং জড়িত ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তদন্তকারীরা জানান, এসব অস্ত্রের অনেকগুলোকে নিষ্ক্রিয় প্রদর্শনী পিস্তল থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্রে রূপান্তর করা হয়েছিল। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অস্ত্র তৈরির প্রবণতাও বাড়ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি পরিসংখ্যানে যে সংখ্যক বন্দুক অপরাধের তথ্য উঠে আসে, বাস্তবে পরিস্থিতি তার চেয়েও বেশি ভয়াবহ। কারণ অনেক ঘটনা পুলিশের কাছে পৌঁছায় না কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয় না। গত এক বছরে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিকভাবে গুলির ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে কয়েকটিতে প্রাণহানিও হয়েছে।
শহরের কিছু এলাকায় পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে বাসিন্দারা নিজেদের চলাচলের পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। রাতের বেলায় বাইরে বের হতে অনেকে ভয় পাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরাও বলছেন, সহিংস ঘটনার পর অনেক মানুষ বিনোদন কেন্দ্র ও রাত্রিকালীন আড্ডাস্থল এড়িয়ে চলছেন।
যুব উন্নয়নকর্মীরা মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংস সংস্কৃতির প্রচার, অনলাইন বিরোধ, দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভ এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব তরুণদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের মতে, অনেক কিশোর আত্মরক্ষার অজুহাতে অস্ত্র বহন শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তা আরও বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সমাজকর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, ছুরি ও বন্দুক বহনকে কেন্দ্র করে এক ধরনের ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতা’ তৈরি হয়েছে। একজন বড় অস্ত্র বহন করলে অন্যজন আরও শক্তিশালী অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করছে। ফলে ছোটখাটো বিরোধও প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে।
পুলিশের বিশেষ সশস্ত্র অপরাধ দমন ইউনিট জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্দুক ব্যবহারের ঘটনা কমানোর ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে তারা স্বীকার করেছে, একটি গুলির ঘটনাও অত্যন্ত গুরুতর এবং নিরীহ মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে। এ কারণে বন্দুক সহিংসতা প্রতিরোধে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বিশ্লেষকদের মতে, শেফিল্ডের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু একটি নগরীর আইনশৃঙ্খলা সংকট নয়; বরং এটি আধুনিক নগর সমাজে তরুণদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া, গ্যাং সংস্কৃতির বিস্তার এবং অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতার একটি উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি। যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

