বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক রেহানা পারভিনের রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্ত ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং এ ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে কুইন্সল্যান্ডের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ—এএফপি। ৫১ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি রেহানা পারভিনের সাবেক স্বামী আওলাদ হোসেন বলে বিভিন্ন অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রেহানা পারভিন ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান-বাংলাদেশি দ্বৈত নাগরিক এবং কুইন্সল্যান্ডের বাসিন্দা। ২০২৪ সালের ৬ জুন তিনি তার কিশোরী মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। পরবর্তী সময়ে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
২০২৪ সালের ৩ জুলাই পরিবারের সদস্যরা সর্বশেষ রেহানা পারভিনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে গর্ভপাতের কারণে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কুইন্সল্যান্ড পুলিশ সার্ভিসে রেহানা পারভিনের নিখোঁজের রিপোর্ট করা হয়। ওই রিপোর্টের পর অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু করে। এর পরের দিন বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ ঢাকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গ্রামের মাটির নিচে পুঁতে রাখা একটি মরদেহের সন্ধান পায়। পরে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহটি রেহানা পারভিনের বলে নিশ্চিত করা হয়।
বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার মৃত্যুকে সন্দেহজনক হিসেবে দেখা হয়। পরে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশও ঘটনাটিকে সন্দেহজনক মৃত্যু হিসেবে তদন্তের আওতায় নেয়। রেহানা পারভিনের মৃত্যুর বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশও পৃথক তদন্ত শুরু করে।
এএফপির তদন্তে অভিযোগ ওঠে, রেহানা পারভিনের সাবেক স্বামী আওলাদ হোসেন বাংলাদেশের তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তদন্তে নিজের নাম পুলিশি নথি থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে থাকা কয়েকজন সহযোগীর মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
এএফপির হিসাবে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে একাধিক আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে প্রায় ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার পাঠানো হয়। পুলিশের অভিযোগ, এসব অর্থ বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের অংশ হিসেবে সিডনি ও ব্রিসবেনের কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের নথি ও ব্যাংক রেকর্ড জব্দ করা হয়।
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আওলাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে এএফপি। একই সঙ্গে কুইন্সল্যান্ডের গুডনা ও রেডব্যাংক প্লেইন্সে থাকা কয়েকটি বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় তদন্তকারীরা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করেন।
আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিমিনাল কোড-এর ৭০.২(১) ধারায় বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড।
এএফপি কমান্ডার স্টিফেন জে বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া বা বিদেশে তদন্ত প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিগ্রস্ত করার যেকোনো চেষ্টা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে কোনো গুরুতর অপরাধের তদন্তের ফলাফল প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ঘুষ বা দুর্নীতির অভিযোগকে এএফপি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে বলে জানান তিনি।
স্টিফেন জে আরও বলেন, যারা বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করবে, তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। তদন্তের বিষয়ে অস্ট্রেলিয়া ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে এএফপি।
এদিকে রেহানা পারভিনের মৃত্যুর তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ এবং বাংলাদেশ পুলিশ—উভয় পক্ষই নিজ নিজ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
এএফপি জানিয়েছে, ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে আদালতে মামলা করার ক্ষেত্রে এটি সংস্থাটির প্রথম ঘটনা।
সূত্রঃ এএফপি\এবিসি নিউজ
এমকে

