TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকবাংলাদেশ

বাংলাদেশে ছিলেন প্রসূতি বিশেষজ্ঞ, অস্ট্রেলিয়ায় এখন লন্ড্রিকর্মীঃ স্কিল্ড ওয়ার্কারদের বাস্তব চিত্র

বাংলাদেশে একজন অভিজ্ঞ প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত ছিলেন রাবেয়া। উন্নত কর্মজীবন ও নতুন সম্ভাবনার আশায় তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানে গিয়ে চিকিৎসক হিসেবে নয়, বর্তমানে তাসমানিয়ার লন্সেস্টনে একটি শিল্প লন্ড্রিতে হাসপাতালের লিনেন ও বালিশের কভার ভাঁজ করার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তার এই অভিজ্ঞতা অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি দক্ষ পেশাজীবীদের যোগ্যতার স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থান সংকটের একটি প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে।

অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এসবিএস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে বর্তমানে লাইসেন্সনির্ভর পেশায় শিক্ষিত ও যোগ্য আড়াই লাখের বেশি স্থায়ী অভিবাসী নিজেদের যোগ্যতার তুলনায় অনেক নিচু স্তরের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। অথচ একই সময়ে স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, শিক্ষা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষ জনবলের উল্লেখযোগ্য সংকট রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে একটি হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগে কর্মরত থাকা রাবেয়া অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স না পাওয়ায় স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন বিকল্প পদে আবেদন করেন। তিনি হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগ, সাধারণ চিকিৎসাকেন্দ্র, ফার্মেসি এবং স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির চেষ্টা করলেও কোথাও সাক্ষাৎকারের সুযোগ পাননি। তার ধারণা, স্থানীয় কাজের অভিজ্ঞতার অভাবই চাকরি না পাওয়ার অন্যতম কারণ।

নিজের পেশায় ফিরে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে রাবেয়া বর্তমানে ল্যাবরেটরি মেডিসিনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করছেন। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি তাসমানিয়ার লন্সেস্টনে অবস্থিত ব্লুলাইন লন্ড্রি নামের একটি সামাজিক উদ্যোগভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২৫০ জন কর্মী রয়েছেন, যাদের প্রায় অর্ধেকই বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসী। তাদের অনেকেই নিজ নিজ দেশে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক কিংবা অন্যান্য উচ্চদক্ষ পেশায় কর্মরত ছিলেন।

অভিবাসীদের দক্ষতা নিয়ে কাজ করা অ্যাক্টিভেট অস্ট্রেলিয়াস স্কিলস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে অর্জিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত সনদের স্বীকৃতি পাওয়ার বর্তমান ব্যবস্থা ব্যয়বহুল, জটিল, দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রেই অন্যায্য। ফলে হাজার হাজার দক্ষ অভিবাসী তাদের প্রকৃত যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা ব্যক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতির উন্নয়নে ২০২৫ সালের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার মাইগ্রেশন স্কিলস রিকগনিশন রিফর্ম কর্মসূচির আওতায় আগামী চার বছরে ৮ কোটি ৫০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। সরকারের দাবি, এই উদ্যোগ বিদেশে অর্জিত দক্ষতা ও পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করবে, যাতে দক্ষ অভিবাসীরা দ্রুত তাদের নিজ নিজ পেশায় যুক্ত হতে পারেন।

তবে ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং অভিবাসী অধিকারকর্মীদের মতে, ঘোষিত সংস্কার এখনও যথেষ্ট নয়। তাদের দাবি, স্থানীয় অভিজ্ঞতার বাধ্যবাধকতা কমানো, লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিদেশি যোগ্যতার দ্রুত মূল্যায়নের ব্যবস্থা না করলে দক্ষ অভিবাসীদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই তাদের প্রকৃত পেশার বাইরে কাজ করতে বাধ্য হবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, রাবেয়ার গল্প কেবল একজন বাংলাদেশি চিকিৎসকের ব্যক্তিগত সংগ্রামের কাহিনি নয়; এটি অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থা, বিদেশি সনদের স্বীকৃতি এবং দক্ষ জনশক্তির কার্যকর ব্যবহারে বিদ্যমান কাঠামোগত সীমাবদ্ধতারও একটি বাস্তব চিত্র। তাদের মতে, বিদেশি পেশাজীবীদের যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন ও দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন দক্ষ জনবলের ঘাটতি কমবে, অন্যদিকে অভিবাসীদের সম্ভাবনাও পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

সূত্রঃ এসবিএস

এম.কে

আরো পড়ুন

ভারী বর্ষণ, সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যার শঙ্কা

আমরা আপনার সরকারের সাথে কাজ করতে উন্মুখঃ ড. ইউনূসকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

দেশের দুটি কিডনিই খেয়ে ফেলেছে বিগত সরকারঃ ড. দেবপ্রিয়