সুন্দরবনের কাছে নির্মিত রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আর্থিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যুক্তরাজ্যের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক বার্কলেসের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবন অঞ্চলের তিন ব্যক্তি ও সংগঠন যুক্তরাজ্য সরকারের অফিস ফর রেসপন্সিবল বিজনেস কন্ডাক্টে এই অভিযোগ দাখিল করেছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আগে প্রকল্পটির পরিবেশগত ও মানবাধিকার ঝুঁকি যথাযথভাবে যাচাই করেনি বার্কলেস। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার নির্দেশনা লঙ্ঘন করেছে ব্যাংকটি।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রকল্পের অংশ। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে এবং সুন্দরবনের কাছেই পশুর নদীর তীরে এর অবস্থান। সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত।
অভিযোগে বলা হয়েছে, রামপাল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ ও বন্ড ইস্যুতে আন্ডাররাইটিং সেবা দিয়েছে বার্কলেস। অভিযোগকারীদের সহায়তাকারী কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এনটিপিসি লিমিটেডের ঋণ আন্ডাররাইট করেছে ব্যাংকটি। এনটিপিসি রামপাল প্রকল্পের অন্যতম যৌথ অংশীদার।
এ ছাড়া ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের বন্ড ইস্যুতেও বার্কলেসের ভূমিকা ছিল বলে জানিয়েছে ক্লিনিকটি। ওই ভারতীয় প্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে রামপাল প্রকল্পে ঋণ দেয়।
ঢাকাভিত্তিক পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল অভিযোগকারীদের একজন। তার দাবি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আশপাশের শিল্পকারখানা থেকে সৃষ্ট ভারী ধাতুর দূষণ সুন্দরবনের আন্তঃসংযুক্ত নদী ও খালগুলোর মাধ্যমে বনে প্রবেশ করছে। পশুর নদী সুন্দরবনের পরিবেশব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বলে তিনি জানান।
গত নভেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকার পানিতে পারদ ও আর্সেনিকের মাত্রা বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব পাওয়া যায় পশুর নদীতে। গবেষকেরা শিল্পবর্জ্য ও বন্দরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডকে ভারী ধাতু দূষণের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন।
গবেষণায় কয়লা পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট নির্গমন এবং রামপাল প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নৌযান চলাচল বৃদ্ধিকেও সুন্দরবনের জন্য পরিবেশগত ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, এই দূষণের প্রভাব শুধু স্থানীয় পরিবেশে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষ নদী ও বন থেকে খাদ্য এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। একই সঙ্গে এই বন রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
অভিযোগকারীরা আরও বলেছেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে।
শরীফ জামিলের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করার দায়িত্ব রয়েছে। অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন রামপাল প্রকল্প থেকে সরে গেছে বা অর্থায়ন প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন বার্কলেসসহ অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরও নিজেদের নীতি পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন।
অভিযোগকারীদের সহায়তাকারী কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিকের আইনজীবী সু উইলম্যান বলেন, সুন্দরবনের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী জলবায়ু ও প্রকৃতির সংকটের সম্মুখসারিতে রয়েছে। তেল ও কয়লা প্রকল্পে অর্থায়নের আগে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করাই তাদের লক্ষ্য বলে তিনি জানান।
রামপাল প্রকল্প নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগে প্রকল্পটির পরিকল্পনা ও নির্মাণ নিয়েও আপত্তি উঠেছিল। ২০১৬ সালে ইউনেসকোর এক প্রতিবেদনে রামপাল প্রকল্পের কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের বায়ু ও পানি দূষণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।
এদিকে যুক্তরাজ্যের ব্যবসা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অফিস ফর রেসপন্সিবল বিজনেস কন্ডাক্ট এখন অভিযোগটি পর্যালোচনা করবে। দপ্তরটি অভিযোগটি আনুষ্ঠানিক তদন্তের জন্য গ্রহণ করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
বার্কলেস ব্যাংক এবং রামপাল প্রকল্পের হোল্ডিং কোম্পানি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

