উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্টে চলমান সহিংসতায় নতুন ও উদ্বেগজনক মাত্রা যোগ করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিবাসীদের আবাসনের তালিকা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ। কমিউনিটি নেতাদের দাবি, সুসংগঠিত ডিজিটাল ট্র্যাকিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অভিবাসীদের যৌথ আবাসনগুলোকে চিহ্নিত করে অনলাইনে প্রচার করা হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত ও বিপজ্জনক করে তুলেছে।
সোমবার এক আশ্রয়প্রার্থীকে ঘিরে সংঘটিত ছুরিকাঘাতের ঘটনার পর শহরের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তবে পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিবাসীদের সম্ভাব্য ঠিকানার তালিকা প্রকাশের ফলে সহিংসতা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে উত্তর বেলফাস্টের টাইগার্স বে এলাকা এবং ডনেগাল রোড করিডোরে হামলা, ভাঙচুর এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের একাধিক ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি এতটাই অবনতির দিকে যায় যে, ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।
দক্ষিণ বেলফাস্টের সুপরিচিত কমিউনিটি নেতা পল ডোহার্টি এই সংকটের মানবিক দিকটি তুলে ধরে বলেন, সহিংসতার কারণে অনেক পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তিনি সাংবাদিকদের জানান, একটি কমিউনিটি সংহতি কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে আসা এক মাকে তিনি নিজের গাড়ির ভেতরে কান্নারত অবস্থায় দেখেন। গাড়ির পেছনের আসনে থাকা তার তিন শিশুও আতঙ্কে কাঁদছিল। ওই মা দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি পোস্টে তাদের বাসার ঠিকানাও যুক্ত করা হয়েছিল।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেলফাস্টে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির ওপর। স্থানীয় কমিউনিটি সূত্রের দাবি, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে শহরটিতে বসবাসরত তিন হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি কার্যত ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না এবং সন্তানদের স্কুলে পাঠানো নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, টাইগার্স বে এলাকা থেকে অন্তত তিনটি বাংলাদেশি পরিবারের ১১ সদস্যকে জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছেন। মঙ্গলবার রাত আনুমানিক নয়টার দিকে মুখোশধারী একদল ব্যক্তি এসব বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালালে পুলিশ দ্রুত হস্তক্ষেপ করে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা জানিয়েছেন, আকস্মিকভাবে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় তারা প্রয়োজনীয় পোশাক, ওষুধ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথিপত্র পর্যন্ত সঙ্গে নিতে পারেননি। বর্তমানে তাদের অবস্থান গোপন রাখা হয়েছে এবং সরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় রাখা হয়েছে।
সহিংসতার প্রভাব শুধু আবাসিক এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও। বিশেষ করে অভিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন বহু প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। স্যান্ডি রোসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় বাংলাদেশি মালিকানাধীন দোকানপাটও বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্য সাদিকুর রহমান বলেন, প্রায় দুই দশক ধরে বেলফাস্টকে তিনি একটি শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল শহর হিসেবে দেখেছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর সাম্প্রতিক প্রবণতা তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। তার মতে, এই ধরনের ঘটনা বেলফাস্টের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার করে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করার প্রবণতা আধুনিক সমাজের জন্য নতুন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো এবং ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের মতো কর্মকাণ্ড দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। কমিউনিটি নেতারা সকল পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার দায় পুরো অভিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বেলফাস্টের প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রধান চাওয়া—নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং এমন একটি সামাজিক পরিবেশ, যেখানে ভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষ ভয়ের পরিবর্তে আস্থার সঙ্গে বসবাস করতে পারবেন।
সূত্রঃ এনএসটি অনলাইন
এম.কে

