14.9 C
London
June 2, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

বৈধভাবে থাকা শিশুদেরও যুক্তরাজ্য ছাড়ার নির্দেশঃ ক্ষোভে অভিবাসী পরিবারগুলো

যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাসরত পাঁচ বছর বয়সী শিশুসহ একাধিক অভিবাসী পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে পাঠানো চিঠি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অভিবাসী অধিকারকর্মী, আইনজীবী ও কেয়ার খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে পরিবার বিচ্ছেদের ঝুঁকিতে পড়েছেন বহু বিদেশি কর্মী।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হোম অফিস) সম্প্রতি কয়েকটি পরিবারের শিশুদের উদ্দেশে চিঠি পাঠিয়েছে, যেখানে তাদের যুক্তরাজ্য ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীও স্বামীর কাছ থেকে পৃথক হয়ে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অধিকাংশই কেয়ার কর্মী ভিসার আওতায় যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন। ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত কেয়ার কর্মীরা তাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের নির্ভরশীল সদস্য হিসেবে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারতেন। তবে অভিবাসন কমানোর লক্ষ্যে সরকার পরে সেই সুযোগ বাতিল করে।

স্কটল্যান্ডের পার্থে বসবাসকারী শ্রীলঙ্কান কেয়ার কর্মী ভরুনি আরাচ্চিগে বলেন, তাদের আট ও পাঁচ বছর বয়সী দুই সন্তান স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করছে এবং সমাজের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। অথচ সম্প্রতি তার সন্তানদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যদিও তার নিজের ভিসার মেয়াদ ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা ২০২২ সালে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে এসেছি। নিয়ম মেনে বসবাস করছি, কর দিচ্ছি এবং কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা নিচ্ছি না। তারপরও আমার স্বামী ও সন্তানদের চলে যেতে বলা হয়েছে।”

হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় এক লাখ কেয়ার কর্মীর সঙ্গে আরও প্রায় এক লাখ ২০ হাজার পারিবারিক সদস্য যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন। এর পরই সরকার কেয়ার কর্মীদের পরিবারের সদস্য আনার সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে নতুন আবেদনকারীদের জন্য পরিবার আনার সুযোগ বন্ধ করা হয় এবং ২০২৫ সালের জুলাই থেকে বিদেশ থেকে কেয়ার কর্মী নিয়োগেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

তবে যেসব পরিবার সম্প্রতি দেশ ছাড়ার নির্দেশ পেয়েছে, তারা এসব বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার আগেই বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছিল। ফলে নতুন সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিবাসন আইনজীবীরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাদের মতে, অনেক কেয়ার কর্মী এমন অবস্থায় পড়েছেন যেখানে চাকরি ধরে রাখা এবং পরিবারের সঙ্গে থাকা—দুইয়ের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হচ্ছে।

২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে আসা আরেক কেয়ার কর্মী রাসিকা সমারাসিংহে জানান, তার স্ত্রী একজন শিক্ষক সহকারী হিসেবে কাজ করেন এবং তাদের তিন সন্তান স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করছে। কিন্তু সম্প্রতি তাদের যুক্তরাজ্যে থাকার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা সব নিয়ম মেনেছি, কর পরিশোধ করেছি এবং আইন ভঙ্গ করিনি। আমি শুধু আমার সন্তানদের জন্য একটি ভালো ভবিষ্যৎ চাই। পরিবার ছাড়া আমি কিছুই করতে পারি না।”

এমটিসি সলিসিটরসের আইনজীবী নাগা কান্দিয়াহ বলেন, অভিবাসী কেয়ার কর্মীদের এমন এক পরিস্থিতিতে ফেলা হচ্ছে যেখানে তারা হয় দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক কাজ চালিয়ে যাবেন, নয়তো পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি নেবেন।

অভিবাসীদের অধিকারবিষয়ক সংগঠন মাইগ্র্যান্টস রাইটস নেটওয়ার্কের প্রধান নির্বাহী ফিজা কোরেশি সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, কেয়ার কর্মীরা স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবাখাতের অন্যতম ভিত্তি হলেও তাদের প্রতি মানবিক আচরণের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এদিকে অভিবাসী কেয়ার কর্মীদের মধ্যে পরিচালিত সাম্প্রতিক দুটি জরিপে দেখা গেছে, স্থায়ী বসবাসের জন্য অপেক্ষার সময় পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১৫ বছর করা হলে বিপুলসংখ্যক কর্মী যুক্তরাজ্য ত্যাগের কথা ভাবছেন। একটি জরিপে অংশ নেওয়া ৬৯ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তারা দেশ ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে অভিবাসী কেয়ার কর্মীরা প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৪২ লাখ ঘণ্টা সেবা প্রদান করছেন এবং প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষের দেখভালের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ফলে কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে এই কর্মীদের বড় অংশ দেশ ছেড়ে গেলে যুক্তরাজ্যের সামাজিক সেবাখাত বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।

অন্যদিকে হোম অফিস জানিয়েছে, সীমান্ত ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে সরকার ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম চালাচ্ছে। তাদের ভাষ্য, যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করা কোনো অধিকার নয়, বরং এটি একটি সুযোগ, যা অবদান ও নিয়ম মেনে চলার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

পশ্চিম লন্ডনে ডিটেনশন সেন্টারে দাঙ্গা

আগামী মাস থেকে ব্রিটিশ পাসপোর্টের ফি বাড়ছে

নিউজ ডেস্ক

যুক্তরাজ্যের ত্রিশটি ইংলিশ কাউন্সিল বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ পেল