16.7 C
London
October 9, 2026
TV3 BANGLA
মুক্তমত

ব্যাংকের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জন্ম নিল এটিএম মেশিন: ব্যাংকিং লেনদেন বদলে দেওয়া সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত

নাশীত রহমান || লন্ডন || ০৮ অক্টোবর ২০২৬

 

এটিএম মেশিন ১৯৮৫ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত উন্নত বিশ্বের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। শহরের রাস্তায়, সুপারশপে, ব্যাংকের বাইরে—এটিএম ছিল নগদ অর্থ তোলার সবচেয়ে সহজ ও নির্ভরযোগ্য উপায়। এমনকি উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও ২০০০ সালের পর থেকে নগর এলাকায় এটিএম দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

এটিএম মূলত একটি স্বয়ংক্রিয় অর্থ প্রদানকারী যন্ত্র—যার মাধ্যমে টাকা উত্তোলন, জমা, ব্যালেন্স দেখা এবং বিভিন্ন ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পন্ন করা যেত। মানুষের ব্যাংকিং অভ্যাসে এটি ছিল এক বড় পরিবর্তন।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং ক্যাশলেস লেনদেনের প্রসার এটিএমের ব্যবহারকে ধীরে ধীরে কমিয়ে দিয়েছে। এখন বিশ্বের বহু দেশে নগদ অর্থের ব্যবহার কমে আসছে, সমাজগুলো দ্রুত ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। ফলে এটিএমের ব্যবহারও ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। ধীরে ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই, এটিএম একদিন ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে—এক সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, যা আধুনিক ব্যাংকিংয়ের বিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

এটিএম আবিষ্কারের আগে ব্যাংকিং ছিল সম্পূর্ণভাবে নগদ লেনদেননির্ভর। ব্যাংক যখন খোলা থাকত, তখনই কেবল একজন গ্রাহক তাঁর অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দিতে বা উত্তোলন করতে পারতেন। ব্যাংকের সময়সীমা ছিল কঠোর, আর সেই সময়সীমার বাইরে কোনো লেনদেনের সুযোগ ছিল না। ফলে অনেক সময় জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে অপেক্ষা করতে হতো পরের দিন পর্যন্ত।

ব্যাংকের কাউন্টারে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা—একসময় এটি ছিল নগদ অর্থ তোলার একমাত্র উপায়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ব্যাংকের সামনে ভিড় জমত। কেউ বেতন তুলছেন, কেউ ব্যবসার লেনদেন করছেন, কেউ জরুরি প্রয়োজনে নগদ অর্থ নিচ্ছেন—সবকিছুই নির্ভর করত ব্যাংকের খোলা থাকার ওপর।

আজ সেই দৃশ্য স্মৃতির মতো। শহরের ব্যস্ত মোড়, গ্রামাঞ্চলের বাজার, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কিংবা শপিং মল—যেখানেই যান, হাতের নাগালে এটিএম। কয়েক সেকেন্ডে কার্ড ঢোকান, পিন দিন, আর টাকা হাতে। ব্যাংকের সময়সীমা, লাইনের ভিড়, কাউন্টারের অপেক্ষা—সবকিছু যেন অতীতের গল্প।

কিন্তু এই সুবিধার জন্ম হয়েছিল একেবারে নাটকীয়ভাবে—মাত্র এক মিনিটের দেরি থেকে। একটি ব্যাংকের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সেই ক্ষুদ্র মুহূর্তই পরবর্তীতে বদলে দেয় বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং ব্যবস্থার চেহারা।

১৯৬৫ সালের এক সন্ধ্যায় জন শেফার্ড‑ব্যারন লন্ডনের একটি ব্যাংকের দিকে দ্রুত পা বাড়াচ্ছিলেন। দরজার ওপাশে আলো তখনও জ্বলছিল, কিন্তু তিনি পৌঁছালেন ঠিক বন্ধ হওয়ার এক মিনিট পরে। এক মিনিট—যা তাঁর জীবনের গতিপথই বদলে দেবে। দরজার ভেতরের আলো নিভে গেল, কাউন্টার ফাঁকা হয়ে গেল। প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে না পেরে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে ফিরে এলেন হতাশ হয়ে। কিন্তু সেই হতাশা তাঁর মাথায় জন্ম দিল এক প্রশ্ন— চকলেট ভেন্ডিং মেশিন যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চকলেট দিতে পারে, তবে ব্যাংকের কেন ভেন্ডিং মেশিন দিয়ে টাকা  দিতে পারবে না?

এই প্রশ্নই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে আধুনিক ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় বিপ্লবের সূচনা। ভারতে জন্ম, ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা—এক বহুসংস্কৃতির প্রকৌশলী জন শেফার্ড‑ব্যারনের জীবন শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ ভারতের মাটিতে। তাঁর বাবা তখন ভারতে কর্মরত ছিলেন, সেই সময়ই ভারতে তাঁর জন্ম। শৈশবের প্রথম স্মৃতিগুলো ভারতীয় পরিবেশে গড়ে ওঠে—উপনিবেশিক অফিসপাড়া, রেলস্টেশন, ব্রিটিশ প্রশাসনিক আবহ।পরবর্তীতে পরিবার ইংল্যান্ডে ফিরে আসে। সেখানেই তাঁর শিক্ষা, বেড়ে ওঠা, এবং প্রকৌশল‑মনস্কতা বিকশিত হয়।

ভারতের বহুসংস্কৃতির অভিজ্ঞতা আর ইংল্যান্ডের প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশ—দুটি ভিন্ন জগতের অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাকে আরও স্বাধীন, আরও উদ্ভাবনী করে তোলে। এই পটভূমিই তাঁকে সেই সন্ধ্যায় ব্যাংকের দরজা বন্ধ দেখে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করেছিল।

হতাশা থেকে উদ্ভাবন: বাড়ি ফেরার পথে জন্ম নিল ধারণা, সেদিন ব্যাংক থেকে ফেরার সময় তাঁর মাথায় ঘুরছিল একটাই ভাবনা— মানুষের প্রয়োজনের মুহূর্তে ব্যাংক কেন বন্ধ থাকবে? প্রযুক্তি কি মানুষের সময়কে বাঁচাতে পারে না? চকলেট ভেন্ডিং মেশিনের মতো একটি মেশিন যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা দিতে পারে—তাহলে ব্যাংকিংয়ের চেহারাই বদলে যাবে। এই ভাবনা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তিনি বাড়ি পৌঁছানোর আগেই ধারণাটি প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে যায়।

সেই এক মিনিটের দেরি তাঁর মাথায় যে স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিল, তা পরবর্তীতে হয়ে ওঠে এটিএম—বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং বিপ্লবের নাম।বাড়ি ফেরার পথে তাঁর মাথায় ঘুরতে থাকে একটি প্রশ্ন— চকলেট ভেন্ডিং মেশিন যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চকলেট দিতে পারে, তবে ব্যাংকের টাকা কেন নয়?

একটি সাধারণ প্রশ্ন। কিন্তু সেই প্রশ্নই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে আধুনিক ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় বিপ্লবের সূচনা। দুই বছরের গবেষণা শেষে ১৯৬৭ সালের ২৭ জুন উত্তর লন্ডনের এনফিল্ডে Barclays Bank চালু করল বিশ্বের প্রথম এটিএম মেশিন। সেদিন ব্যাংকের বাইরে ছিল উৎসুক মানুষের ভিড়। কেউ সন্দেহে, কেউ কৌতূহলে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন—একটি মেশিন সত্যিই কি টাকা দিতে পারে? এটিএম মেশিনের প্রথম গ্রাহক ছিলেন জনপ্রিয় ব্রিটিশ কৌতুক এবং বিনোদনকর্মী অভিনেতা রেগ ভার্নি। তাঁর হাতে প্রথম নোট বেরিয়ে আসার মুহূর্তটি যেন প্রযুক্তির নতুন সকাল।

প্রথম এটিএম আজকের এটিএমের মতো ছিল না, একেবারে ভিন্ন ছিল। আজ আমরা এটিএমে প্লাস্টিক কার্ড ব্যবহার করি। কিন্তু প্রথম এটিএমে কোন প্লাস্টিক কার্ড কার্ড ছিল না। গ্রাহকদের দেওয়া হতো বিশেষ কাগজের ভাউচার। এটিএম মেশিনে ভাউচার ঢোকালে পাওয়া যেত সর্বোচ্চ ১০ পাউন্ড। এটিএম মেশিনটি অনলাইনভিত্তিকও ছিল না—ব্যাংক পরে হিসাব মিলিয়ে নিত। তবুও এটি ছিল এক বিপ্লবের প্রথম ধাপ।

এটিএম মেশিনে প্লাস্টিক কার্ডের ব্যবহার আধুনিক ব্যাংকিংয়ের নতুন অধ্যায়ের সুচনা করে। ১৯৭০-এর দশকে এটিএম মেশিনে যুক্ত হয় ম্যাগনেটিক স্ট্রিপযুক্ত প্লাস্টিক কার্ড। আইবিএম প্রকৌশলী ফরেস্ট প্যারি ১৯৬৯ সালে এটিএম কার্ডে ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ সংযুক্ত করার কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। ১৯৭৫ সালে বার্কলেজ ব্যাংক চালু করল উন্নত এটিএম কার্ড ও পিন নম্বর ব্যবহার করে টাকা তোলার আধুনিক ব্যবস্থা।

ব্যাংকিং তখন সত্যিই নতুন যুগে প্রবেশ করল। এটিএম মেশিনে প্লাস্টিক কার্ডের আগমন, ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় লেনদেন—সব মিলিয়ে ব্যাংকিং ধীরে ধীরে কাউন্টারনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে প্রযুক্তিনির্ভর এক আধুনিক ব্যবস্থায় রূপ নিতে শুরু করল। গ্রাহক আর ব্যাংকের সময়সীমার মধ্যে বন্দী থাকলেন না; ব্যাংক যেন মানুষের কাছে পৌঁছে গেল যন্ত্রের মাধ্যমে। এই পরিবর্তন শুধু সুবিধা নয়, ছিল এক নতুন আর্থিক সংস্কৃতির সূচনা।

এই নতুন যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিল পিন নম্বরের আবিষ্কার। এটিএমের মাধ্যমে টাকা তোলার সুবিধা তখনও নতুন, কিন্তু নিরাপত্তা ছিল বড় প্রশ্ন। কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে যে কার্ডধারী ছাড়া অন্য কেউ টাকা তুলতে পারবে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করেন স্কটিশ প্রকৌশলী জেমস গুডফেলো। তিনি উদ্ভাবন করেন এনক্রিপ্টেড কার্ড ও ব্যক্তিগত শনাক্তকরণ নম্বর—পিন। এটি ছিল ব্যাংকিং নিরাপত্তায় এক বিপ্লব।

পিন নম্বরের ধারণা এতটাই কার্যকর ছিল যে দ্রুতই এটি বিশ্বব্যাপী মানদণ্ডে পরিণত হয়। চার অঙ্কের পিনে ১০ হাজার সম্ভাব্য সমন্বয় তৈরি হয়—যা নিরাপত্তা ও ব্যবহারিক সুবিধার মধ্যে নিখুঁত ভারসাম্য এনে দেয়। পিনের কারণে গ্রাহক প্রথমবারের মতো নিজের ব্যাংকিং নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ পেলেন নিজের হাতে। কার্ড তাঁর, পিন তাঁর—এটিএমে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেই নিজের পরিচয় নিশ্চিত করছেন। ব্যাংকিং ইতিহাসে এটি ছিল এক মৌলিক পরিবর্তন।

এটিএম নিরাপত্তার মূল স্তম্ভ—পিন নম্বর। স্কটিশ প্রকৌশলী জেমস গুডফেলো ১৯৬৬ সালে এনক্রিপ্টেড কার্ড ও পিনভিত্তিক নগদ উত্তোলন ব্যবস্থার পেটেন্ট পান। তাঁর উদ্ভাবনই আজ বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা মানদণ্ড। আরও নাটকীয় তথ্য—জন শেফার্ড‑ব্যারন প্রথমে ছয় অঙ্কের পিন ভাবলেও তাঁর স্ত্রী ক্যারোলিন বলেন, বেশিরভাগ মানুষ ছয় অঙ্ক মনে রাখতে পারবেন না। তাঁর পরামর্শেই পিন হয় চার অঙ্কের—যা আজও বিশ্বব্যাপী মানদণ্ড।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য—শেফার্ড‑ব্যারন তাঁর নকশার পেটেন্ট নেননি। ব্যাংকের আইনজীবীরা মনে করেছিলেন, পেটেন্ট নিলে প্রযুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করতে হবে, যা অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। গোপনীয়তা বজায় রাখতে তাই পেটেন্ট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একটি সিদ্ধান্ত, যা আজও প্রযুক্তি ইতিহাসে আলোচনার বিষয়।

ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল পেমেন্ট এবং অনলাইন ট্রান্সফারের যুগেও এটিএমের গুরুত্ব পুরোপুরি কমে যায়নি। নগদ অর্থের প্রয়োজন এখনও বিশ্বের বহু দেশে বিদ্যমান, বিশেষ করে যেখানে ডিজিটাল অবকাঠামো সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত নয় বা যেখানে নগদ লেনদেন সামাজিক‑অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Datos Insights-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে বিশ্বে কার্যক্রমে ছিল প্রায় ২৯ লাখ এটিএম—যা প্রমাণ করে যে এটিএম এখনও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার একটি বড় অংশ ধরে রেখেছে।

এটিএমের এই বিশাল উপস্থিতির পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ। প্রথমত, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নগদ লেনদেন এখনও প্রধান মাধ্যম, ফলে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের সুবিধার জন্য এটিএম নেটওয়ার্ক বজায় রাখছে। দ্বিতীয়ত, পর্যটননির্ভর দেশগুলোতে বিদেশি নাগরিকদের নগদ উত্তোলনের প্রয়োজনীয়তা এটিএমকে এখনও কার্যকর রাখে। তৃতীয়ত, জরুরি পরিস্থিতি—যেমন নেটওয়ার্ক বিভ্রাট, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যর্থতা বা কার্ড‑ভিত্তিক লেনদেনের সমস্যা—এটিএমকে একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে ধরে রেখেছে।

এটিএম প্রযুক্তিও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। আধুনিক এটিএম এখন শুধু টাকা তোলার যন্ত্র নয়; অনেক দেশে এগুলো দিয়ে বিল পরিশোধ, অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার, চেক ডিপোজিট, এমনকি বায়োমেট্রিক যাচাইকরণও করা যায়। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে চিপ‑কার্ড, অ্যান্টি‑স্কিমিং প্রযুক্তি, রিয়েল‑টাইম মনিটরিং এবং মাল্টি‑ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন।

তবে এই সব উন্নয়ন সত্ত্বেও এটিএমের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে নগদ লেনদেনের হার দ্রুত কমে আসছে। সুইডেন, নরওয়ে, দক্ষিণ কোরিয়া এবং নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো প্রায় ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগিয়ে গেছে, যেখানে এটিএমের সংখ্যা প্রতি বছরই কমছে। ব্যাংকগুলোও খরচ কমানোর জন্য এটিএম নেটওয়ার্ক সংকুচিত করছে।

ফলে এটিএম এখন এক ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—একদিকে এখনও কোটি মানুষের প্রয়োজনীয় সেবা, অন্যদিকে ধীরে ধীরে কমে আসা ব্যবহার। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনই ইঙ্গিত দেয় যে ভবিষ্যতে এটিএম হয়তো একটি ঐতিহাসিক প্রযুক্তি হিসেবে স্মৃতিতে থাকবে, কিন্তু আজও এটি বিশ্বের বহু অঞ্চলে আর্থিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

এটিএম একসময় আধুনিক ব্যাংকিংয়ের অপরিহার্য উপাদান ছিল। নগদ অর্থ তোলার সুবিধা, দ্রুত লেনদেন এবং ব্যাংকের সময়সীমার বাইরে সেবা পাওয়ার সুযোগ—সব মিলিয়ে এটিএম মানুষের আর্থিক জীবনে এক বিপ্লব এনেছিল। কয়েক দশক ধরে এটি ছিল নগদ লেনদেনের প্রধান ভরসা এবং ব্যাংকিং সুবিধার প্রতীক।

কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি আর্থিক ব্যবস্থাকে নতুন পথে নিয়ে গেছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং ক্যাশলেস লেনদেনের বিস্তার মানুষের ব্যাংকিং অভ্যাসকে আমূল বদলে দিয়েছে। ফলে এটিএমের প্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। নগদ অর্থের ব্যবহার কমছে, আর অনেক দেশ সম্পূর্ণ ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে।

এই পরিবর্তনের ধারায় এটিএমের ব্যবহারও ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। যে প্রযুক্তি একসময় আধুনিকতার প্রতীক ছিল, তা এখন ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার কাছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটিএম হয়তো একদিন ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে—এক যুগের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রযুক্তি, যা মানুষের জীবনকে সহজ করেছিল এবং ব্যাংকিংয়ের বিবর্তনে এক অনন্য ভূমিকা রেখেছিল।

আরো পড়ুন

নিয়ন্ত্রণের ভারে বদলে যাওয়া অবস্থান- ব্রেক্সিটের এক দশক পর ব্রিটেনের প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের ইউরোপ‑দ্বিধা

আফ্রিকা ধীরে ধীরে বিভক্ত হচ্ছে: পূর্ব আফ্রিকান রিফটের জন্ম, কারণ ও ভবিষ্যৎ

পশ্চিমা সভ্যতার সন্ধিক্ষণ: বিবাহের পতন, জন্মহার সংকট ও পরিবারবিহীন ভবিষ্যতের অশনি সংকেত