ব্রিটেনে অভিবাসীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা ইন্ডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (আইএলআর) পাওয়ার নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। নতুন পরিকল্পনায় অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য স্থায়ী বসবাসের সাধারণ যোগ্যতার মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হচ্ছে। তবে কিছু শরণার্থীর ক্ষেত্রে এই অপেক্ষার সময় ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। সরকারের এই পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার ও শরণার্থী সহায়তাকারী সংস্থা।
সোমবার (২ নভেম্বর) হাউস অব কমন্সে নতুন ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ বা যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাস নীতির বিস্তারিত তুলে ধরেন শাবানা মাহমুদ। সরকারের যুক্তি, ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হবে না; বরং কাজ, আয়, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং অন্যান্য শর্ত পূরণের মাধ্যমে এই অধিকার অর্জন করতে হবে।
তবে নতুন নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শরণার্থীদের ক্ষেত্রে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসাসহ অনিয়মিত পথে প্রবেশকারী কিছু শরণার্থীকে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে সর্বোচ্চ ৩০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এ সময়ে তাদের প্রতি ৩০ মাস অন্তর অস্থায়ী বসবাসের অনুমতি নবায়ন করতে হবে।
শরণার্থী কাউন্সিলের বহির্বিষয়ক নির্বাহী পরিচালক ইমরান হুসেইন এই পরিকল্পনাকে ‘অন্যায্য ও বাস্তবায়ন-অযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, শরণার্থীদের এমন একটি অবস্থায় রাখা হচ্ছে, যেখানে তাদের প্রতি ৩০ মাস পরপর বসবাসের অনুমতি নবায়ন করতে হবে এবং এই অনিশ্চয়তা ৩০ বছর পর্যন্ত চলতে পারে। এতে তারা ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে জীবন গড়ে তোলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন।
ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির যুক্তরাজ্য শাখার নির্বাহী পরিচালক ফ্লোরা আলেকজান্ডার বলেন, ৩০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী বসবাসের অপেক্ষায় থাকলে শরণার্থীদের জীবনের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটবে। যারা যুদ্ধ ও নির্যাতন থেকে পালিয়ে এসেছেন, তাদের জীবন নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, লেবার সরকারের নতুন পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে পরিচর্যা খাতের বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে। আগে এই খাতের কম বেতনভুক্ত কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের জন্য ১৫ বছর অপেক্ষার প্রস্তাব থাকলেও নতুন সিদ্ধান্তে অধিকাংশ যোগ্য কর্মীর জন্য পাঁচ বছরের পথ বহাল রাখা হয়েছে।
হোম অফিস জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসে অভিবাসনসংক্রান্ত শ্বেতপত্র প্রকাশের আগে যারা কেয়ার ওয়ার্কার ভিসায় এসেছেন অথবা এই ভিসায় পরিবর্তন করেছেন, তারা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে আগের মতো পাঁচ বছরেই আইএলআরের আবেদন করতে পারবেন। এজন্য বছরে অন্তত ২৫ হাজার পাউন্ড বেতন, স্পনসরশিপ এবং চাকরির শর্ত পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি নতুন নীতির আওতায় ইংরেজি ভাষা ও অপরাধসংক্রান্ত শর্তও পূরণ করতে হবে।
যেসব পরিচর্যা কর্মী ২০২৫ সালের মে মাসের আগে এসেছেন, কিন্তু পাঁচ বছরের স্থায়ী বসবাসের শর্ত পূরণ করতে পারবেন না, তাদের দ্বিতীয় পাঁচ বছরের ভিসার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তবে ২০২৫ সালের মে মাসের পর আসা কর্মীদের ক্ষেত্রে এই বিশেষ সুবিধা প্রযোজ্য হবে না।
এদিকে, বছরে ৫০ হাজার ২৭১ পাউন্ডের বেশি আয় করা অভিবাসী কর্মীরা পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারবেন। এ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু সরকারি জনসেবা খাতের পেশায় নিয়োজিত কম বেতনভুক্ত কর্মীদের জন্যও পাঁচ বছরের পথ বহাল রাখা হয়েছে।
নতুন নিয়মের কারণে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ আগের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাবেন বলে জানিয়েছেন শাবানা মাহমুদ। তার দাবি, এই পরিবর্তনের ফলে সরকারের কল্যাণ ভাতা খাতে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় হবে।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। লেবার এমপি ডায়ান অ্যাবট সতর্ক করে বলেছেন, আগে থেকে বৈধভাবে ব্রিটেনে এসে কাজ করা মানুষের বসবাসের অধিকার পরিবর্তন করা অন্যায্য এবং এটি নতুন করে উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারির মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। জবাবে শাবানা মাহমুদ বলেন, অভিবাসন পরিস্থিতি ও ব্যবস্থার অপব্যবহার বিবেচনায় নিয়ে সরকার অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে।
ব্রিটেনের আইনজীবী সমিতি ল সোসাইটিও নতুন পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডানা ডেনিস-স্মিথ বলেন, যারা আগের নিয়মের ওপর নির্ভর করে নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম পরিবর্তন আইনি নিশ্চয়তাকে দুর্বল করে। শরণার্থীদের জন্য ২০ থেকে ৩০ বছরের অপেক্ষার বিধান ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের অঙ্গীকারের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে, অভিবাসীদের স্থায়ী বসবাসের অপেক্ষার সময় বাড়ানোর বিষয়ে ব্রিটিশ জনগণের মধ্যে সমর্থন তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছে ইউগভের একটি জরিপ। জরিপে ৪৭ শতাংশ উত্তরদাতা অপেক্ষার সময় বাড়ানোর পক্ষে এবং ৩৫ শতাংশ বিপক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে পরিচর্যা কর্মীদের জন্য পাঁচ বছরের পথ বহাল রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (টিইউসি)। সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক পল নওয়াক বলেছেন, পরিচর্যা কর্মীরা দেশের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে কর্মীদের নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের সুযোগসহ শোষণ ও দুর্ব্যবহার থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে খাতভিত্তিক ভিসা চালু করা প্রয়োজন।
ব্রিটিশ ব্যবসায়ী সংগঠন সিবিআইয়ের পক্ষ থেকে অবশ্য প্রশ্ন তোলা হয়েছে, স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা খাতের কর্মীদের ছাড় দেওয়ার পর অন্যান্য দক্ষ কর্মীদের ক্ষেত্রে স্থায়ী বসবাসের সময় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা কতটা রয়েছে।
অন্যদিকে, রিফর্ম ইউকে নেতা নাইজেল ফারাজ বলেছেন, তার দল ক্ষমতায় এলে নতুন নীতির আওতায় স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়টি পর্যালোচনা করবে। তবে তার এই রাজনৈতিক বক্তব্য বর্তমান সরকারের ঘোষিত নীতির অংশ নয়।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এমকে

