12.7 C
London
October 20, 2026
TV3 BANGLA
মুক্তমতযুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেন কি আবার বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ চালু করবে?

নাশীত রহমান | লন্ডন | ২০ অক্টোবর ২০২৬

 

বিশ্বব্যবস্থায় অস্থিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির প্রেক্ষাপটে ব্রিটেনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন। যুদ্ধ শুরু হলে কত বছর বয়সীদের সেনাবাহিনীতে ডাকা হবে? নারী-পুরুষের সমান অধিকার কি সমান সামরিক দায়িত্বও তৈরি করবে? আর বাধ্যতামূলক যুদ্ধে অংশগ্রহণের নির্দেশ পেলে কী করবেন জেনারেশন জেডের তরুণ-তরুণীরা?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলত জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং শক্তির ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব থাকলেও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাত প্রতিরোধ সব সময় সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষত রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ ইউরোপের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাতের বিস্তার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্যপথ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তবে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়া এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়। বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করতে হলে রাষ্ট্রগুলোর সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি কূটনৈতিক সম্পর্ক, পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থা এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও বিবেচনা করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত অবস্থান এবং ইউরোপের নিরাপত্তা – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। ন্যাটোর মাধ্যমে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি এবং ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর দাবিকে কেন্দ্র করে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো ক্রমেই উপলব্ধি করছে, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করা দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

এই বাস্তবতায় ব্রিটেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি, সামরিক সক্ষমতা, অস্ত্র উৎপাদন এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনার ওপর অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নির্দিষ্ট কূটনৈতিক অবস্থানকে সরাসরি রাশিয়ার পক্ষে সামরিক অবস্থান গ্রহণের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা যথার্থ নয়। প্রতিটি সিদ্ধান্তকে তার নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হবে।

ব্রিটেন কি অদূর ভবিষ্যতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে? ব্রিটেন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য, পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র এবং ন্যাটোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি। ফলে ইউরোপে কোনো বড় সামরিক সংঘাত সৃষ্টি হলে ব্রিটেনের সম্পূর্ণভাবে তার বাইরে থাকা কঠিন হতে পারে। ব্রিটেনের সম্ভাব্য সামরিক সম্পৃক্ততার কয়েকটি পরিস্থিতি রয়েছে।

প্রথমত, রাশিয়া ও ন্যাটোর সরাসরি সংঘাত। রাশিয়া কোনো ন্যাটো সদস্যরাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চালালে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী যৌথ প্রতিরক্ষার প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে অনুচ্ছেদ ৫ কার্যকর হলেই প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থলযুদ্ধে সৈন্য পাঠাতে হবে, এমন নয়। প্রতিটি দেশ প্রয়োজনীয় সহায়তার ধরন নির্ধারণ করে।

দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী কিংবা মিত্ররাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে ব্রিটেন সীমিত সামরিক অভিযানে অংশ নিতে পারে।

তৃতীয়ত, সাইবার ও অবকাঠামোগত আক্রমণ। ভবিষ্যতের যুদ্ধ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিদ্যুৎ সরবরাহ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, হাসপাতাল, পরিবহন এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাও আক্রমণের লক্ষ্য হতে পারে।

চতুর্থত, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সামরিক সংঘাত হলে ব্রিটেনের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা সামরিক সম্পৃক্ততার প্রশ্ন উঠতে পারে।

এসব পরিস্থিতি সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের ইতিহাস – ব্রিটেনে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ বা Conscription নতুন কোনো ধারণা নয়। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগেই ব্রিটিশ সরকার সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে সীমিত সামরিক নিয়োগব্যবস্থা চালু করে। সে বছরের মে মাসে পাস হওয়া Military Training Act অনুযায়ী ২০ থেকে ২২ বছর বয়সী নির্দিষ্ট শ্রেণির অবিবাহিত পুরুষদের ছয় মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়। ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে National Service (Armed Forces) Act পাস করা হয়। এর মাধ্যমে ১৮ থেকে ৪১ বছর বয়সী পুরুষদের সামরিক সেবার জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের প্রয়োজন অনুযায়ী বয়সসীমা বাড়ানো হয় এবং নারীদেরও নির্দিষ্ট ধরনের জাতীয় সেবায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

তবে চিকিৎসাগতভাবে অযোগ্য ব্যক্তি এবং কৃষি, চিকিৎসা, প্রকৌশলসহ অপরিহার্য পেশায় কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ ছাড় বা বিকল্প দায়িত্বের ব্যবস্থা ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, জাতীয় অস্তিত্বের সংকট দেখা দিলে সরকার সাধারণ নাগরিকদের ওপরও সামরিক বা জাতীয় সেবার দায়িত্ব আরোপ করতে পারে—যদি তার জন্য যথাযথ আইন প্রণয়ন করা হয়।

বর্তমানে ব্রিটেনে কি বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ রয়েছে? বর্তমানে ব্রিটেনে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের কোনো সাধারণ আইন কার্যকর নেই। নতুন করে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ চালু করতে হলে সরকারকে সংসদীয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

যুদ্ধ শুরু হলে কত বছর বয়সীদের ডাকা হতে পারে? এ প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর হলো, বর্তমানে ব্রিটেনে ভবিষ্যৎ বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের জন্য কোনো নির্ধারিত বয়সসীমা নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ১৮ থেকে ৪১ বছরের নিয়ম আজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে না। ভবিষ্যতে সরকার বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ চালু করতে চাইলে নতুন আইনে বয়সসীমা, স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা, পেশাগত ছাড়, লিঙ্গভিত্তিক বিধান এবং বিকল্প জাতীয় সেবার ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে।

ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের প্রথমে বিবেচনা করা হতে পারে। কিন্তু ১৮–২৫, ১৮–৩০ কিংবা ১৮–৪১—কোনো বয়সসীমাকেই বর্তমান সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই। যুদ্ধের ধরন, প্রয়োজনীয় সেনাসংখ্যা, সামরিক প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জনমতের ওপর ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।

নারীদেরও কি বাধ্যতামূলক যুদ্ধে অংশ নিতে হবে? আধুনিক ব্রিটেনে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্য সামরিক নিয়োগ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: রাষ্ট্র যদি পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়, তাহলে নারীদের ক্ষেত্রেও কি একই দায়িত্ব প্রযোজ্য হবে?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন নারীদের বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল। ১৯৪১ সালের আইন অনুযায়ী ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী অবিবাহিত নারী এবং নিঃসন্তান বিধবাদের নির্দিষ্ট সামরিক সহায়ক ও জাতীয় সেবার দায়িত্ব পালনের জন্য ডাকা যেত। তবে নারী ও পুরুষের দায়িত্ব এক ছিল না। নারীদের প্রধানত সামরিক সহায়ক বাহিনী, যোগাযোগ, পরিবহন, চিকিৎসা, প্রশাসন এবং অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা হতো। বর্তমানে ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর সব সামরিক ভূমিকা নারীদের জন্য উন্মুক্ত। ২০১৮ সাল থেকে নারীরা সম্মুখসমরের স্থলবাহিনীর ভূমিকাতেও যোগদানের সুযোগ পাচ্ছেন। এ কারণে ভবিষ্যতে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ চালু হলে শুধু পুরুষদের ওপর দায়িত্ব আরোপ করা হবে, নাকি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।

সমান অধিকার কি সমান দায়িত্বের দাবিও সৃষ্টি করে? এ প্রশ্নের দুটি দিক রয়েছে। একদিকে যুক্তি দেওয়া যেতে পারে, নারী-পুরুষ রাষ্ট্রের সমান নাগরিক হলে জাতীয় প্রতিরক্ষার দায়িত্বও সমান হওয়া উচিত। অন্যদিকে সামরিক দায়িত্ব নির্ধারণে শারীরিক সক্ষমতা, গর্ভাবস্থা, সন্তান লালনপালন, প্রতিবন্ধকতা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামরিক প্রয়োজনের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার যুক্তি রয়েছে। ব্রিটেনের Equality Act 2010 এবং মানবাধিকার আইনের আলোকে নতুন কোনো নিয়োগব্যবস্থার বৈষম্যমূলক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে সামরিক বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর নিয়োগসংক্রান্ত বিশেষ আইনগত বিধানও রয়েছে। ফলে সমতার নীতি প্রয়োগের বিষয়টি সাধারণ কর্মসংস্থান আইনের মতো সরল নয়। ভবিষ্যতে সংসদ চাইলে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সামরিক বা বেসামরিক জাতীয় সেবার ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে এমন কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা কার্যকর নেই।

জেনারেশন জেড: যুদ্ধের ডাক পেলে কী করবেন তরুণ-তরুণীরা? সম্ভাব্য বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো জেনারেশন জেডের প্রতিক্রিয়া। সাধারণভাবে ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারীদের জেনারেশন জেড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৬ সালে এই প্রজন্মের বয়স আনুমানিক ১৪ থেকে ২৯ বছর। অর্থাৎ সম্ভাব্য সামরিক নিয়োগের ক্ষেত্রে এই প্রজন্মের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যরা বিশেষভাবে আলোচনায় আসতে পারেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার তরুণদের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা, জীবনযাপন ও সামাজিক বাস্তবতার উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।

আজকের তরুণরা ডিজিটাল প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশ্বায়ন, মানবাধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। তাঁদের কাছে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পেশাগত ভবিষ্যৎ, শিক্ষা, মানসিক সুস্থতা এবং যুদ্ধের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যুদ্ধের ডাক এলে তাঁদের প্রতিক্রিয়া একরকম হবে না।

জেনারেশন জেডের একটি অংশ বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধিতা করতে পারেন। তাঁরা ব্যক্তিস্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা এবং যুদ্ধবিরোধী নৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে প্রতিবাদ করতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ, রাজনৈতিক প্রচার, সংসদীয় আবেদন এবং আদালতে আইনগত চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে নির্ভরযোগ্য ও প্রতিনিধিত্বশীল জনমত জরিপ ছাড়া ব্রিটিশ জেনারেশন জেডের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যুদ্ধ করতে অস্বীকার করবে অথবা স্বেচ্ছায় যোগ দেবে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।

যুদ্ধ করতে অস্বীকার করলে কী হবে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনে বিবেকগত কারণে সামরিক দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানানো ব্যক্তিদের Conscientious Objectors বলা হতো। তাঁদের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালের ব্যবস্থা ছিল। আবেদনকারীরা ধর্মীয়, নৈতিক বা বিবেকগত কারণে অস্ত্র হাতে নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারতেন। ট্রাইব্যুনাল পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ অব্যাহতি, শর্তযুক্ত অব্যাহতি কিংবা যুদ্ধবহির্ভূত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিতে পারত। তবে সবাই অব্যাহতি পেতেন না। আইনগত দায়িত্ব অমান্য করলে শাস্তির ঝুঁকিও ছিল।

ভবিষ্যতে ব্রিটেনে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ চালু হলে বিবেকগত আপত্তিকারীদের অধিকার এবং বিকল্প সেবার ব্যবস্থা নতুন আইনে কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে। ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৯-এর অধীনে বিবেক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতার বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

শুধু ব্রিটিশ নাগরিক, নাকি অভিবাসীদেরও ডাকা হতে পারে? ব্রিটেনের বহুজাতিক সমাজে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সম্ভাব্য সামরিক নিয়োগ কি শুধু ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য হবে? ব্রিটেনে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা Indefinite Leave to Remain (ILR), Skilled Worker visa, Student visa এবং অন্যান্য অভিবাসন অনুমতি নিয়ে বসবাস করেন। বর্তমানে এসব অভিবাসন মর্যাদার কারণে কাউকে বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হয় না।

ভবিষ্যতে নতুন আইন প্রণয়ন করা হলে সংসদকে নির্ধারণ করতে হবে কারা সেই আইনের আওতায় পড়বেন। এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ নাগরিক, দ্বৈত নাগরিক, কমনওয়েলথ নাগরিক এবং বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে আইনগত পার্থক্য থাকতে পারে। বিশেষত দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে অন্য দেশের সামরিক দায়িত্ব ও নাগরিকত্বের প্রশ্নও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তবে ভবিষ্যৎ আইনের বিষয়বস্তু এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

আধুনিক যুদ্ধ কি বিপুলসংখ্যক সৈন্যের প্রয়োজন কমিয়ে দেবে? প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধের অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল বিপুলসংখ্যক সৈন্য। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের প্রযুক্তিগত চরিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার যুদ্ধ, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা সামরিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ব্রিটিশ সরকারের ২০২৫ সালের Strategic Defence Review-তে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, জাতীয় প্রস্তুতি এবং সমগ্র সমাজকে নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ভবিষ্যতের যুদ্ধে শুধু সম্মুখসমরে সৈন্য পাঠানোই যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হতে পারে প্রকৌশলী, চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ, সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ, যোগাযোগকর্মী, পরিবহনকর্মী এবং জরুরি সেবার দক্ষ জনবলের। ফলে কোনো ভবিষ্যৎ জাতীয় সেবাব্যবস্থা চালু হলে তা শুধু সামরিক প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন ধরনের বেসামরিক দায়িত্বও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা কতটা? বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বৃহত্তর সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি অস্বীকার করা যায় না। তবে আগামী এক বা দুই বছরের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে—এমন নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দেওয়ার মতো ভিত্তি নেই। ব্রিটেনের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি বাস্তবসম্মত নিরাপত্তা উদ্বেগ হতে পারে সীমিত আঞ্চলিক সংঘাতে অংশগ্রহণ, ন্যাটো মিত্রদের সহায়তা, সাইবার আক্রমণ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকট।

অন্যদিকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা বড় ধরনের সংঘাত প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে পারে। অতএব, বর্তমান পরিস্থিতিকে অবধারিত বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হিসেবে নয়, বরং উচ্চমাত্রার আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা প্রতিযোগিতার সময় হিসেবে বিবেচনা করাই অধিক যুক্তিসংগত।

সমান অধিকার, সমান দায়িত্ব এবং নতুন প্রজন্মের সামনে কঠিন প্রশ্ন – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের তরুণ প্রজন্মের সামনে প্রশ্ন ছিল, দেশকে রক্ষা করার জন্য কে অস্ত্র হাতে নেবেন? একবিংশ শতাব্দীতে সেই প্রশ্ন আরও জটিল। আজকের ব্রিটেনে নারী-পুরুষের সমান অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবাধিকার, বিবেকের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দায়িত্বকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

যদি কখনো ব্রিটেন বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সরকারকে শুধু কতজন সৈন্য প্রয়োজন, সেই প্রশ্নের উত্তর দিলেই চলবে না। তাকে ব্যাখ্যা করতে হবে কেন যুদ্ধ প্রয়োজন, কারা দায়িত্ব পালন করবেন, নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে কী নীতি অনুসরণ করা হবে, কী ধরনের অব্যাহতি থাকবে এবং যাঁরা বিবেকগত কারণে অস্ত্র হাতে নিতে চান না, তাঁদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে। বিশেষত জেনারেশন জেডের কাছে রাষ্ট্রকে সামরিক দায়িত্বের প্রয়োজনীয়তা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে হতে পারে। কারণ গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকদের সহযোগিতা অর্জনের জন্য শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়, রাজনৈতিক আস্থা ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো কে যুদ্ধে যাবেন, তা নয়; বরং আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা কেন এমন পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে নতুন প্রজন্মকে আবারও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কথা ভাবতে হচ্ছে।

 

তথ্যসূত্র

House of Commons Library — Conscription and National Service in the UK। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর গবেষণায় ব্রিটেনের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের ইতিহাস ও আইনগত অবস্থা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

House of Commons Library UK Parliament — Conscription: The Second World War। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পুরুষ ও নারীদের নিয়োগের বয়স এবং অব্যাহতির ঐতিহাসিক বিবরণ।

House of Commons Library — Whole of Society Approach (2 September 2026)। জাতীয় প্রতিরক্ষায় সামরিক ও বেসামরিক প্রস্তুতির আলোচনা।

UK Government — Strategic Defence Review 2025। ব্রিটেনের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা।

সাম্প্রতিক ঘটনা: ১২ অক্টোবর ২০২৬ রয়টার্সের প্রতিবেদনে ন্যাটোর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার রাশিয়াকে সতর্ক করে বলেছেন, ন্যাটো ভূখণ্ডে আক্রমণ হলে জোট কঠোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে, তবে আসন্ন বিশ্বযুদ্ধের নিশ্চয়তা দেয় না।

আরো পড়ুন

অর্থনৈতিক মন্দায় বন্ধ হচ্ছে আর্গোস (Argos)

ইংল্যান্ডে ১৬ বছরের কিশোর-কিশোরীর নিকাহ সম্পন্ন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইমাম দোষী সাব্যস্ত

যুক্তরাজ্যে £১৮ মিলিয়নের কোকেন চোরাচালান মামলাঃ চারজনের সাজা, গ্যাং ধরতে সতর্কতা জারি