20.3 C
London
October 2, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রেক্সিটের ১০ বছর পর ইইউতে ফেরার আলোচনাঃ বিরোধিতা করছে রিফর্ম ইউকে

ব্রেক্সিটের প্রায় এক দশক পর যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আবারও তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ ইউরোপ-সম্পর্কের বিভিন্ন সম্ভাবনা বিবেচনার কথা বলার পর জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেনের শীর্ষ পর্যায় থেকে ব্রিটেনকে ফের স্বাগত জানানোর বার্তা এসেছে। তবে দেশের ভেতরে এ নিয়ে জনমত একমুখী নয় এবং রিফর্ম ইউকে সরাসরি পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়ার বিরোধিতা করছে।

জার্মানির যুক্তরাজ্যবিষয়ক রাষ্ট্রদূত সুসানে বাউমান বলেছেন, ব্রিটেন ইউরোপের ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্রিটিশ জনগণ যদি ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার সিদ্ধান্ত নেয়, জার্মানি সেখানে অংশীদার হিসেবে থাকবে—এমন বার্তাই দিয়েছেন তিনি।

এর আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এবং স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও ব্রিটেনের সম্ভাব্য ইইউ প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানান। তবে মাখোঁ সতর্ক করে বলেছেন, ইইউতে ফিরে গেলে সদস্যপদের সুবিধাগুলো থেকে বেছে বেছে কিছু নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত ইউগভের জরিপে দেখা যায়, ৫৫ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে, আর ৩৪ শতাংশ এর বিরোধিতা করেন। ২০১৬ সালের গণভোটে ‘লিভ’ ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও ২৩ শতাংশ এখন পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়ার পক্ষে।

তবে পুরো বিষয়টি শুধু ‘ইইউতে ফিরবে কি ফিরবে না’—এমন সরল সমীকরণ নয়।

একই ইউগভ জরিপে ৫৯ শতাংশ মানুষ বলেছেন, যুক্তরাজ্যের ইইউর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা উচিত, কিন্তু সরাসরি ইইউ, একক বাজার বা শুল্ক ইউনিয়নে যোগ দেওয়া প্রয়োজন নেই। এই বিকল্পটি ‘রিমেইন’ ও ‘লিভ’—দুই পক্ষের ভোটারদের মধ্যেই তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত সমর্থন পেয়েছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইইউতে ফেরার ক্ষেত্রে আগের বিশেষ সুবিধাগুলো রাখা যাবে কি না। ইউগভের তথ্যে দেখা যায়, আগের অপ্ট-আউটগুলো—যেমন ইউরো বা শেনজেনের বাইরে থাকার সুবিধা—রাখা না গেলে ইইউতে ফেরার সমর্থন ৫৫ শতাংশ থেকে নেমে ৩৫ শতাংশে চলে যায়।

অর্থাৎ, অনেক ব্রিটিশ নাগরিক ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার পক্ষে থাকলেও পূর্ণ সদস্যপদ এবং তার সম্ভাব্য শর্ত নিয়ে জনমত আরও জটিল।

সেপ্টেম্বরের ব্রিটিশ ফিউচার গবেষণাতেও দেখা যায়, ৪৬ শতাংশ মানুষ ইইউতে ফেরার পক্ষে এবং ২৯ শতাংশ বাইরে থাকার পক্ষে; তবে প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ তখনও সিদ্ধান্তহীন ছিলেন। একই গবেষণায় ৫৬ শতাংশ মানুষ বর্তমান সরকারের ঘোষিত সীমারেখার চেয়েও ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে মত দেন।

জনমত জরিপের ফলাফল প্রশ্নের ধরন ও সময়ের ওপর নির্ভর করছে। মে ২০২৬-এর ওপিনিয়াম জরিপে মাত্র ৩৬ শতাংশ যুক্তরাজ্যের ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। আর এপ্রিলের জরিপে সমর্থন ছিল ৩৪ শতাংশ, যেখানে ৫২ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে ইইউর বাইরে থাকার পক্ষে ছিলেন।

তাই সাম্প্রতিক জরিপগুলো থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো—ইইউ নিয়ে ব্রিটিশ জনমত পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু পূর্ণ সদস্যপদ বনাম ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বনাম বর্তমান অবস্থান—এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর এক নয়।

রিফর্ম ইউকে এবং দলটির নেতা নাইজেল ফারাজ ব্রিটেনের ইইউতে ফিরে যাওয়ার ধারণার বিরোধিতা করছেন।

২ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ফারাজ অ্যান্ডি বার্নহ্যামের ইউরোপ-নীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন এবং দাবি করেন, বার্নহ্যামের ব্রেক্সিট নিয়ে নতুন আলোচনা রিফর্ম ইউকের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে।

এর আগেও রিফর্ম ইউকে স্পষ্টভাবে বলেছে, তারা ব্রেক্সিটের ফলাফল ধরে রাখার পক্ষে এবং ইইউর সঙ্গে এমন কোনো সম্পর্ক চায় না, যা তাদের মতে ব্রেক্সিটের মাধ্যমে অর্জিত সিদ্ধান্তকে কার্যত উল্টে দেয়। দলের জুনের বক্তব্যে ফারাজ ব্রেক্সিটকে ব্রিটিশ রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং দাবি করেন, তার দল ব্রেক্সিটের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের পক্ষে।

ফারাজের সাম্প্রতিক বক্তব্যে আরও একটি রাজনৈতিক হিসাব উঠে এসেছে। তার মতে, বার্নহ্যাম যখন ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় আনছেন, তখন ব্রেক্সিটপন্থী ভোটারদের সামনে রিফর্ম ইউকের অবস্থান আরও স্পষ্ট করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটি ফারাজ ও রিফর্ম ইউকের রাজনৈতিক মূল্যায়ন; জনমতের স্বাধীন পরিমাপ হিসেবে এটিকে দেখা উচিত নয়।

বার্নহ্যাম বলেছেন, যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ ইউরোপীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান ব্যবস্থা বজায় রাখা, শুল্ক ইউনিয়নের দিকে যাওয়া, একক বাজারে ফিরে যাওয়া কিংবা পূর্ণ ইইউ সদস্যপদ—বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করা উচিত। তিনি সম্ভাব্য গণভোটের দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করেননি।

তবে ইইউতে ফিরে গেলেও ব্রিটেন আগের মতো বিশেষ শর্ত পাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ইইউর সাবেক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে সদস্য হলে যুক্তরাজ্যকে ইউরো ও শেনজেনসহ ইইউর বিভিন্ন সাধারণ নীতিতে অংশগ্রহণের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং আগের বাজেট রিবেটও ফিরে নাও আসতে পারে।

ফলে ব্রিটেনের সামনে এখন শুধু ‘ব্রেক্সিট থাকবে নাকি বাতিল হবে’—এমন দ্বিমুখী প্রশ্ন নেই। বরং মূল বিতর্ক হচ্ছে—ইউরোপের সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠ হবে যুক্তরাজ্য, সেই সম্পর্কের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শর্ত কী হবে এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য গণভোট প্রয়োজন হবে কি না।

ব্রেক্সিটের এক দশক পর তাই যুক্তরাজ্যে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নটি আবারও জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

এমকে

আরো পড়ুন

ইংলিশ ফুটবলারদের নিয়ে বর্ণবাদী মন্তব্য, গ্রেপ্তার ১১

যুক্তরাজ্যে ভারতীয় শিক্ষার্থীর কাণ্ডঃ কাচ মুছে জোরপূর্বক £২০ দাবিতে তোলপাড়

রাজনীতিতে কিছু পুরুষ “পশুর মতো আচরণ করে”: সুয়েলা ব্র্যাভারম্যান