আসন্ন শীত মৌসুমে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্রিটেনে সাধারণ মানুষের প্রস্তুতি বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ে নতুন প্রচারাভিযান শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব, তীব্র আবহাওয়া, বন্যা ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটসহ বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে পরিবারগুলো কীভাবে প্রস্তুত থাকবে, তা নিয়ে জনগণকে সচেতন করা হবে।
ব্রিটেনের নিরাপত্তা মন্ত্রী ড্যান জারভিস জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকার জনগণকে জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় যতটা সম্ভব প্রস্তুত ও সক্ষম করে তুলতে সরকার কাজ করছে। তিনি বলেন, চলতি শীত মৌসুমে দেশকে ‘বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের’ মুখোমুখি হতে হতে পারে।
সরকারের নতুন প্রচারাভিযানে সাধারণ মানুষকে জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ঘরে রাখার পাশাপাশি নিরাপদে বের হওয়ার পথ এবং জরুরি যোগাযোগের নম্বর সম্পর্কে জানতে উৎসাহিত করা হবে।
সরকারি এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন, কোনো দুর্যোগ দেখা দিলে তাদের পরিবার মোটামুটি বা পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।
প্রচারাভিযানে পরিবারগুলোকে ঘরে ব্যাটারি বা হাত ঘুরিয়ে চালানো টর্চ, বোতলজাত পানি এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবার রাখার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হবে।
এল নিনো নিয়ে মানুষকে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ড্যান জারভিস বলেন, এবারের গ্রীষ্ম কঠিন গেছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম দাবানল মোকাবিলায় একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং সরকার সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে।
ড্যান জারভিস বলেন, শীতের জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। আবহাওয়া কেমন হবে তা পরে দেখা যাবে, তবে সম্ভাবনার বিচারে চলতি শীত মৌসুমে দেশকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনো একটি জলবায়ুগত ঘটনা, যা বর্তমানে রেকর্ড পর্যায়ের শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে চলতি শরৎ ও শীতের সময়ে বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শীতের শেষ দিকে হঠাৎ ঠান্ডা আবহাওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ধরন পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সম্ভাব্য প্রভাব বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে বলে বিজ্ঞানীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
ড্যান জারভিস বলেন, সরকারের প্রচারাভিযানের মাধ্যমে মানুষকে এমন কিছু সহজ পদক্ষেপ সম্পর্কে জানানো হবে, যা প্রত্যেক পরিবার নিজ নিজ ঘরে গ্রহণ করতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি বাড়লে তা আঞ্চলিক এবং জাতীয় পর্যায়েও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
সরকার প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও সম্পদ প্রস্তুত রাখার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত রাখতে পারেন এবং কীভাবে সহযোগিতা করতে পারেন, সে বিষয়েও সচেতনতা তৈরি করা হবে।
ড্যান জারভিস বলেন, প্রচারাভিযানের বার্তা সহজ ও মানুষের মনে থাকার মতো হওয়া প্রয়োজন। তিনি চান, এ উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে জরুরি প্রস্তুতি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হোক।
ডেইলি মিররের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড্যান জারভিস লেস্টারে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। বারবার বন্যার শিকার হওয়া ওই এলাকায় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতির পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার অংশ হিসেবে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শরৎকালে জাতীয় প্রচারাভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর আগেই প্রায় ৫ হাজার মানুষ এতে যুক্ত হয়েছেন।
লেস্টারের বাসিন্দারা মন্ত্রীকে জানান, ভবিষ্যতে আবার বন্যার কবলে পড়ার আশঙ্কায় তারা উদ্বিগ্ন। তবে তারা নিজেদের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাড়িতে বন্যা প্রতিরোধক ব্যবস্থা স্থাপন করেছেন এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করেছেন।
একটি কর্মশালায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজেদের জরুরি প্রস্তুতি পর্যালোচনা করতে বলা হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে এবং চুলা, মাইক্রোওয়েভসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব না হলে কীভাবে খাবার তৈরি করা যাবে, সেটিও আলোচনায় আসে।
লেস্টারের বাসিন্দা ডেবি রসেল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুইবার বন্যার কারণে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তিনি ডেইলি মিররকে জানান, বন্যার প্রভাব ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ এবং আসন্ন শীত নিয়ে তিনি উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
বন্যার কারণে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ডেবি রসেলকে বাড়ির বাইরে থাকতে হয়েছিল। বাড়িতে ফিরে কিছুদিনের মধ্যেই আবার বন্যার কবলে পড়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত তাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হয়।
তিনি জানান, বন্যার পর বাড়িতে ছাঁচ ও দুর্গন্ধসহ বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয়। বন্যার সতর্কতা জারি হলে তারা নিয়মিত আবহাওয়ার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং বাড়ির সামনে ও পেছনের দরজায় থাকা বন্যা প্রতিরোধক ব্যবস্থা ব্যবহারের প্রস্তুতি নেন।
এলাকার স্থানীয় রেজিলিয়েন্স ফোরাম-এর ব্যবস্থাপক মার্ক ওয়ার্ডেন বলেন, জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতির উদ্দেশ্য মানুষকে ভয় দেখানো নয়; বরং প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে তাদের প্রস্তুত রাখা।
তিনি জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে ১০৫ নম্বরে ফোন করা যায়—এ তথ্য জানা, বিমার গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র প্লাস্টিকের ফাইলে নিরাপদ ও পরিচিত জায়গায় রাখা এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা—এসবও জরুরি প্রস্তুতির অংশ।
মার্ক ওয়ার্ডেন বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হলে মানুষ যাতে আগে থেকেই কিছু সহজ পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে, সেটিই প্রস্তুতির মূল উদ্দেশ্য।
ডেইলি মিররের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগামী সপ্তাহে লেবার পার্টির সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম-এর ভাষণে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে আসতে পারে।
জরুরি কিটে কী কী রাখা উচিতঃ
ব্যাটারি বা হাত ঘুরিয়ে চালানো টর্চ: বিদ্যুৎ চলে গেলে আলো দেওয়ার জন্য টর্চ রাখা উচিত। মোমবাতির তুলনায় টর্চ নিরাপদ বলে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পাওয়ার ব্যাংক: মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য একটি বহনযোগ্য পাওয়ার ব্যাংক রাখা যেতে পারে।
ব্যাটারি বা হাত ঘুরিয়ে চালানো রেডিও: বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জরুরি সংবাদ ও নির্দেশনা শোনার জন্য রেডিও রাখা যেতে পারে।
অতিরিক্ত ব্যাটারি: টর্চ, রেডিও এবং ব্যাটারিনির্ভর চিকিৎসা সরঞ্জামের জন্য অতিরিক্ত ব্যাটারি রাখা প্রয়োজন।
প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম: ব্যান্ডেজ, থার্মোমিটার, জীবাণুনাশক, চোখ পরিষ্কারের দ্রবণ, জীবাণুমুক্ত ড্রেসিং, গ্লাভস, মেডিকেল টেপ এবং টুইজারের মতো সামগ্রী রাখা যেতে পারে।
হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও ভেজা টিস্যু: পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে এগুলো প্রয়োজন হতে পারে।
বোতলজাত পানি: জরুরি পরিস্থিতির মেয়াদ ও পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী পানির পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, বেঁচে থাকার জন্য জনপ্রতি প্রতিদিন কমপক্ষে ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ লিটার পানীয় পানি প্রয়োজন। রান্না ও মৌলিক পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজন ধরলে জনপ্রতি প্রতিদিন ১০ লিটার পানি রাখা হলে আরও সুবিধা হবে।
শিশুর খাবার তৈরি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং পোষা প্রাণীর জন্য অতিরিক্ত পানির প্রয়োজন হতে পারে।
দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবার: রান্না ছাড়াই খাওয়া যায় এমন টিনজাত মাংস, ফল বা সবজি রাখা যেতে পারে। এর সঙ্গে টিন খোলার যন্ত্রও রাখা উচিত। পোষা প্রাণীর খাবারও জরুরি মজুতের তালিকায় রাখা প্রয়োজন।
শিশুর প্রয়োজনীয় সামগ্রী: ডায়াপার ও শিশুর দুধসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখা উচিত। জরুরি অবস্থায় পানি ফুটানো বা শিশুর দুধের বোতল জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব নাও হতে পারে বলে প্রস্তুত অবস্থায় থাকা শিশুর দুধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সূত্রঃ ডেইলি মিরর\জিওভি ডট ইউকে
এমকে

