হাজার হাজার মাইল দূরে প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হচ্ছে শক্তিশালী এল নিনো। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এটি রেকর্ডের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে। ইতোমধ্যে এর সম্ভাব্য তীব্রতার কারণে একে ‘গডজিলা এল নিনো’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে। এর প্রভাবে যুক্তরাজ্য ও উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে চলতি শরৎ ও শীত মৌসুমে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টি ও ঝড়ো আবহাওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেট অফিস।
এল নিনো হলো ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়া। এর ফলে স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন ঘটে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার ধরন বদলে যেতে পারে।
যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের প্রভাব মোকাবিলা করছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে প্রতি শীতে যুক্তরাজ্যে যে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে, তার পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুল পূর্ণ করার সমান।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে লন্ডন। শহরটি তিন দিক থেকে বন্যার ঝুঁকির মুখে রয়েছে—উত্তর সাগর থেকে ঝড়ের জলোচ্ছ্বাস টেমস নদীর জোয়ারের পানি বাড়িয়ে দিতে পারে, নদী ও উপনদীগুলোতে পানি বেড়ে যেতে পারে এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়তে পারে।
২০২১ সালের আকস্মিক বন্যা এবং ২০২২ সালের ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পর লন্ডনের জলবায়ু ঝুঁকি নিয়ে লন্ডন ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স রিভিউ কমিশন করা হয়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ওই পর্যালোচনায় সতর্ক করা হয়েছিল, বড় ধরনের আরেকটি ভূপৃষ্ঠীয় বন্যা মোকাবিলার জন্য রাজধানী যথেষ্ট প্রস্তুত নয় এবং মানুষের জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ঝুঁকি মোকাবিলায় সমুদ্র পর্যবেক্ষণকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন বিজ্ঞানীরা। স্যাটেলাইটের পাশাপাশি সমুদ্রে থাকা হাজার হাজার সেন্সরযুক্ত ভাসমান বয়া থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব বয়া সমুদ্রের তাপমাত্রা, স্রোত এবং তাপের গতিবিধি পরিমাপ করছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গণিতবিদ ড. অ্যাডাম সিকুলস্কি দক্ষিণ কেনসিংটনে বসেই প্রশান্ত মহাসাগরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। নিনো ৩.৪ নামে পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়া বয়াগুলোর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সংগৃহীত প্রায় ৫ লাখ তাপমাত্রা রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বছরের শুরুতে স্বাভাবিকের তুলনায় সামান্য কম থাকা তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে শক্তিশালী এল নিনোর পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজের হাইড্রোডায়নামিক্স ল্যাবরেটরিতেও চরম আবহাওয়ার পরিস্থিতি পুনর্নির্মাণ করে গবেষণা চলছে। দক্ষিণ কেনসিংটনের একটি বেসমেন্টে তৈরি করা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার বর্গমিটার আয়তনের কৃত্রিম সমুদ্র। পুরো ব্যবস্থা চালু হলে এতে প্রায় ১২ লাখ লিটার পানি থাকে।
দুটি বড় ওয়েভ বেসিন ও ছয়টি ফ্লুমের মাধ্যমে গবেষকরা গভীর সমুদ্রের ঢেউ, স্রোত এবং বাতাসের প্রভাবে সৃষ্ট সমুদ্রের বিভিন্ন পরিস্থিতি কৃত্রিমভাবে তৈরি করতে পারেন। ৫৬টি প্যাডেলের সাহায্যে উত্তর সাগরের ঝড়ের মতো পরিস্থিতিও ছোট আকারে পুনর্নির্মাণ করা হয়। গবেষকরা জানান, বাস্তবে উত্তর সাগরের সবচেয়ে বড় ঢেউ প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে।
সমুদ্র পর্যবেক্ষণের পরিধি বাড়াতে ছোট আকারের রোবট নৌকাও ব্যবহার করা হচ্ছে। ওশেনের তৈরি ‘সিয়া স্টারস’ নামে এক মিটার দীর্ঘ বাতাস ও সৌরশক্তিচালিত রোবট নৌকাগুলো বহর আকারে সমুদ্রে পাঠানো হয়। এগুলো আবহাওয়া ও সমুদ্রের পরিস্থিতি পরিমাপ করে সরাসরি তথ্য পাঠাতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য এলাকায় পাঠানো সম্ভব।
বর্তমানে ৩২টি সিয়া স্টার সমুদ্রে রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি আটলান্টিক হারিকেন বেল্টে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের জন্য তথ্য সংগ্রহ করছে।
লন্ডনের ঝুঁকি শুধু বন্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ন্যাশনাল হিট রিস্ক কমিশনের চেয়ার এবং লন্ডন ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স রিভিউয়ের প্রধান এমা হাওয়ার্ড বয়ড বলেছেন, বন্যা, অতিরিক্ত তাপ এবং ভূমি বসে যাওয়ার মতো বিভিন্ন ঝুঁকির ক্ষেত্রে লন্ডনের অবস্থান অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় লন্ডনে বিভিন্ন প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। টলওয়ার্থ রাউন্ডঅ্যাবাউটের একটি এলাকা বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা দেখতে বুনো ফুলের বাগানের মতো। রাস্তার পাশে তৈরি রেইন গার্ডেন অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি শোষণ করার পাশাপাশি ছায়া তৈরি করে। বিভিন্ন পার্কের নিচে তৈরি করা হয়েছে ঝড়ের পানি সংরক্ষণের ট্যাংক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে সড়ক, রেলপথ, হাসপাতাল ও বাড়িঘর নির্মাণ বা সংস্কারের সময় আগামী কয়েক দশকে প্রত্যাশিত আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে।
এল নিনোর প্রভাব ঠিক কতটা হবে তা নিয়ে পূর্বাভাস পরিবর্তিত হতে পারে। তবে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।
সূত্রঃ ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড
এম.কে

