TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

মানি লন্ডারিং দমনে কড়াকড়িঃ যুক্তরাজ্যের আইন ফার্মে এফসিএর কঠোর নজরদারি শুরু

মানি লন্ডারিং দমনে যুক্তরাজ্য সরকার আইন খাতে বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। দেশের আর্থিক খাতের সুনাম রক্ষায় এবং আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় আইন ফার্মগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি আরোপের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ফাইন্যান্সিয়াল কন্ডাক্ট অথরিটি (এফসিএ)–কে আইন খাতের নতুন অ্যান্টি–মানি লন্ডারিং (এএমএল) নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

এই সিদ্ধান্তের ফলে আইন খাতের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতদিন আইন ফার্মগুলোর মানি লন্ডারিং তদারকির দায়িত্ব ছিল নয়টি পৃথক নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতে। নতুন ব্যবস্থায় সেই দায়িত্ব একীভূতভাবে এফসিএর অধীনে আসছে, যা সরকারের ভাষায় তদারকিকে আরও কার্যকর ও ধারাবাহিক করবে।

ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর যুক্তরাজ্যের ভেতরে বা যুক্তরাজ্যের মাধ্যমে প্রায় ১০০ বিলিয়ন পাউন্ড পাচার হয়। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারে আইন ফার্মসহ বিভিন্ন ‘সহায়ক প্রতিষ্ঠান’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণেই সরকার আইন খাতকে মানি লন্ডারিংবিরোধী অভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।

২০১৮ সালে প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ)–এর এক প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের মানি লন্ডারিং তদারকিতে গুরুতর দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে আইন ও হিসাবরক্ষণ খাতে নজরদারি জোরদারের সুপারিশ করা হয়। এরপর থেকে ২০১৭ সালের প্রতিটি জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়নেই যুক্তরাজ্যের আইন খাতকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

২০২৭ সালের আগস্টে আসন্ন নতুন এফএটিএফ পর্যালোচনাকে সামনে রেখে সরকার সংস্কার কার্যক্রমে গতি এনেছে। আর্থিক অপরাধ তদন্তকারী ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এইচকেএ–এর অংশীদার প্রিয়া জুলিয়ানি বলেন, এই সময়সূচি মোটেও কাকতালীয় নয়। তার মতে, আন্তর্জাতিক মহলের কাছে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা উপস্থাপন করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হচ্ছে—সলিসিটরস রেগুলেশন অথরিটি (এসআরএ)–এর কাছ থেকে এফসিএর হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর। এসআরএর জরিমানা ক্ষমতা সীমিত ছিল এবং সাধারণত সহযোগিতামূলক ও দিকনির্দেশনাভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করত। বিপরীতে, এফসিএর হাতে রয়েছে বিস্তৃত ক্ষমতা ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ।

পরিসংখ্যানেই সেই পার্থক্য স্পষ্ট। গত এক বছরে এসআরএ ৮৬টি মানি লন্ডারিং–সংক্রান্ত জরিমানা করে মোট ১৫ লাখ পাউন্ড আদায় করেছে। অন্যদিকে এফসিএ মাত্র ছয়টি মামলায় জরিমানা করেছে প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড। এতে ধারণা করা হচ্ছে, নতুন নিয়ন্ত্রণে আইন ফার্মগুলোকে আরও বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে।

এফসিএর অধীনে নতুন আইন ফার্ম নিবন্ধন করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এইচকেএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে এফসিএ আবেদন পাওয়া প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেয়নি, যেখানে এসআরএ সব আবেদনই গ্রহণ করেছিল। ফলে বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে আইন ফার্মগুলোর জন্য কড়াকড়ি বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এফসিএর এনফোর্সমেন্ট ও মার্কেট ওভারসাইট বিভাগের নির্বাহী পরিচালক স্টিভ স্মার্ট বলেছেন, আর্থিক অপরাধ দমন তাদের অগ্রাধিকার। তাঁর ভাষায়, তথ্যনির্ভর ও অনুপাতসম্মত পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করেই অপরাধ শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা হবে।

সব মিলিয়ে, মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ ও দেশের সুনাম রক্ষার স্বার্থে যুক্তরাজ্যের আইন খাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন আইন ফার্মগুলোর জন্য যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি সরকারের মতে এটি দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে আশ্রয় প্রার্থীদের আবাসন সংকট নিয়ে নতুন বিতর্ক

আবারও আশ্রয়প্রার্থীদের বিবি স্টকহোমে ফেরাচ্ছে যুক্তরাজ্য

অটাম বাজেট ২০২৪: বিলেতের অর্থনীতি এবং প্রপার্টি সেক্টর এর সম্ভাব্য পরিবর্তন

নিউজ ডেস্ক