15.3 C
London
August 22, 2026
TV3 BANGLA
ফিচার

মানুষ নয়, এবার রোবটও চায় বকশিশ—টাকা যাচ্ছে কার পকেটে

এতদিন রেস্তোরাঁ, কফিশপ কিংবা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে ভালো কাজের জন্য মানুষকে বকশিশ দেওয়ার রীতি ছিল। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে সেই চিত্রও বদলে যাচ্ছে। এখন মানুষ নয়, রোবটও ডিজিটাল হাত বাড়িয়ে গ্রাহকের কাছে বকশিশ চাইছে। আর এতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—এই টাকা শেষ পর্যন্ত যাচ্ছে কার পকেটে?

যুক্তরাষ্ট্রে সেবা খাতে রোবটের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘রোবো-টিপিং’ বা রোবটকে বকশিশ দেওয়ার নতুন প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, কফিশপ ও স্বয়ংক্রিয় দোকানে গ্রাহকের বিল পরিশোধের সময় অতিরিক্ত বকশিশ দেওয়ার সুযোগ দেখানো হচ্ছে। ফলে সেবা নেওয়ার পাশাপাশি রোবটকে টিপ দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক।

লাস ভেগাসের ‘টিপসি রোবট’ নামের একটি বারে দুটি রোবোটিক বাহু স্বয়ংক্রিয়ভাবে ককটেল তৈরি করে। একটি পানীয়ের দাম ১৭ ডলার হলেও বিল পরিশোধের সময় অতিরিক্ত ১০ শতাংশ ‘সার্ভিস ফি’ যোগ করার সুযোগ থাকে। অর্থাৎ মানুষ সেবা না দিলেও বকশিশের দরজা খুলে দিয়েছে প্রযুক্তি।

নিউ ইয়র্কের ‘আর্টলি কফি’তেও একই ধরনের ঘটনা দেখা গেছে। সেখানে রোবট বারিস্তা গ্রাহকের কাছ থেকে টিপ চায়। আবার নিউ ইয়র্কের নেওয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এমন একটি দোকান রয়েছে যেখানে কোনো কর্মী নেই। সেখানে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র একটি পানির বোতল কেনার সময়ও গ্রাহককে বকশিশ দেওয়ার পরামর্শ দেয়।

অবশ্য সব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একই নয়। পোর্টল্যান্ডের ‘টপ বার্মিজ’ রেস্তোরাঁয় খাবারের অর্ডার নেন মানুষ। খাবার টেবিলে পৌঁছে দেয় রোবট ওয়েটার। ফলে অনেক গ্রাহক মানব কর্মীর সেবার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বকশিশ দেন।

কিন্তু রোবট নিজেই যখন গ্রাহকের সামনে বকশিশের আবেদন জানায়, তখনই তৈরি হচ্ছে মূল বিতর্ক। কারণ মানব কর্মীকে দেওয়া টিপ সাধারণত তার আয় হিসেবে বিবেচিত হলেও রোবটের জন্য দেওয়া অর্থ শেষ পর্যন্ত কে পাচ্ছে, সে বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্টতা নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের লিহাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক এবং ‘গ্র্যাচুইটি’ বইয়ের সহ-লেখক হোলোনা ওকস মনে করেন, কিছু অসাধু মালিক রোবটের নাম ব্যবহার করে বকশিশের অর্থ নিজেদের কাছে রাখতে পারেন। তার মতে, এ ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো—কার পকেট থেকে টাকা যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত লাভবান হচ্ছে কে।

রোবটকে বকশিশ দেওয়ার বিষয়টি আইনি দিক থেকেও নতুন জটিলতা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানব কর্মীকে দেওয়া টিপের অর্থ মালিক বা ব্যবস্থাপক নিজেদের জন্য নিতে পারেন না। কিন্তু কোনো রোবটকে দেওয়া টিপের মালিকানা কার—এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি হয়নি।

করোনা মহামারির পর ডিজিটাল অর্থ পরিশোধের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় টিপ দেওয়ার প্রস্তাবও বেড়েছে। এমনকি সেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও ডিজিটাল পর্দায় বকশিশের অপশন দেখানো হচ্ছে। ফলে গ্রাহকদের একটি অংশ এটিকে ‘আবেগনির্ভর চাপ’ হিসেবে দেখছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশটির টিপনির্ভর মজুরি ব্যবস্থার কারণে। সাধারণ কর্মীদের জন্য কেন্দ্রীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ৭ দশমিক ২৫ ডলার হলেও নিয়মিত টিপ পাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে মূল মজুরি অনেক কম হতে পারে। ফলে টিপের অর্থ কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস।

তবে রোবট ব্যবহারের সব দিকই নেতিবাচক নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান মনে করছে, রোবটের ব্যবহার সেবা খাতে কর্মী সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে রোবটের আকর্ষণে নতুন ধরনের ব্যবসা তৈরি হচ্ছে, যেখানে রোবটের পাশাপাশি মানব কর্মীদেরও চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

‘আর্টলি কফি’র কনটেন্ট পরিচালক অ্যাবিগেইল স্মাদার্স জানান, গ্রাহকদের অসন্তোষের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল পর্দায় টিপ দেওয়ার অপশন বন্ধ করেছে। এর পরিবর্তে কর্মীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে এবং কিছু জায়গায় রাখা হয়েছে টিপের বাক্স, যার পুরো অর্থ মানব কর্মীরাই পান।

তার বক্তব্য, মানুষকে বঞ্চিত করে খরচ কমানোর জন্য প্রতিষ্ঠানটি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চায় না। তার মতে, প্রযুক্তি নিজে খারাপ নয়; প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই মূল বিষয়।

অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি অব মিসিসিপির আতিথেয়তা প্রযুক্তি বিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ক্যাটেরিনা বেরেজিনা মনে করেন, রোবটের মাধ্যমে সংগৃহীত বকশিশের অর্থ সবসময় কোম্পানির মুনাফায় চলে যায়—এমনটা ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ অর্থ রোবটের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, হালনাগাদ বা প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত মানব শ্রমের খরচ মেটাতেও ব্যবহার হতে পারে।

তবে কর্মী অধিকার সংগঠনগুলোর একটি অংশের অভিযোগ, কম বেতন ধরে রাখার উদ্দেশ্যে সেবা খাতে রোবটের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। তাদের মতে, রোবট ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মী সংকটের মূল কারণ সমাধান না করে বরং শ্রম ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

রোবটকে টিপ দেওয়া উচিত কি না—এ প্রশ্নের উত্তরেও রয়েছে ভিন্ন মত। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ‘দ্য সাইকোলজি অব টিপিং’ বইয়ের লেখক মাইকেল লিন মনে করেন, মানুষ সাধারণত ভালো সেবার পুরস্কার হিসেবে, কর্মীদের কম বেতন বিবেচনায় কিংবা সামাজিক চাপের কারণে টিপ দেয়। রোবটের ক্ষেত্রে এসব কারণ প্রযোজ্য নয়।

তবে বাস্তব গবেষণায় কিছুটা ভিন্ন চিত্রও পাওয়া গেছে। এক সমীক্ষায় মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ রোবট বারটেন্ডারকে টিপ দেওয়ার পক্ষে মত দিলেও যারা সরাসরি রোবট বারটেন্ডারের সেবা নিয়েছেন, তাদের মধ্যে টিপ দেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।

আরও মজার বিষয় হলো, রোবটকে টিপ দিতে প্রথমে অস্বীকৃতি জানানো ৪২ শতাংশ মানুষ পরে মত পরিবর্তন করেছেন, যখন তাদের জানানো হয়েছে যে ওই অর্থ কোনো মানব কর্মীর কাছে যাবে।

ফলে ‘রোবো-টিপিং’ ভবিষ্যতে স্থায়ী সংস্কৃতি হবে, নাকি প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে তৈরি হওয়া সাময়িক প্রবণতা—তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের আচরণই নির্ধারণ করবে এই নতুন বকশিশ সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

শাহরুখের লন্ডনের বিলাসবহুল বাড়ির মূল্য কত?

ক্যানসারের ‘অদৃশ্যতার চাদর’ খুলে দিতে সক্ষম নতুন স্মার্ট ওষুধ

সুখি দেশের তালিকায় শীর্ষে ফিনল্যান্ড, পিছিয়ে গেল যুক্তরাজ্য

নিউজ ডেস্ক