19.6 C
London
June 12, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে অভিবাসীবিরোধী সহিংসতায় আতঙ্কঃ বর্ণবাদী হামলা ও ভয়ভীতির মুখে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে অভিবাসীরা

উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্টে সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় অভিবাসী ও সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিবাসীদের বসবাসের ঠিকানার একটি তালিকা ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় কমিউনিটি নেতারা বলছেন, এই ঘটনাগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; বরং উত্তর আয়ারল্যান্ডে ক্রমবর্ধমান বর্ণবাদ ও অভিবাসীবিরোধী মনোভাবের একটি উদ্বেগজনক প্রতিফলন।

বেলফাস্টের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা কয়েক ডজন ঠিকানার একটি তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঠিকানার অধিকাংশই ছিল অভিবাসীদের যৌথ আবাসন বা হাউস অব মাল্টিপল অকুপেশন (এইচএমও)। তালিকাটি প্রকাশের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ইরিত্রিয়া থেকে শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যে আসা জোসেফ ও সলোমন বর্তমানে বেলফাস্টে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করছেন। তালিকাভুক্ত একটি বাড়ির পাশের রাস্তায় বসবাসকারী জোসেফ বলেন, “আমি বুঝতে পারছিলাম না কী অনুভব করব। যখন ভয় ও অনিশ্চয়তা সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন মানুষ অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়ে।”

তিনি জানান, এতদিন তিনি বেলফাস্টকে নিরাপদ শহর হিসেবে দেখেছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি শহর ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন উৎপাদন খাতে কর্মরত সলোমনও। নিরাপত্তার আশঙ্কায় তিনি কর্মস্থলেও যেতে পারেননি।

দক্ষিণ বেলফাস্টের কমিউনিটি নেতা পল ডোহার্টি বলেন, বুধবার রাতে এক মা তিন সন্তানকে নিয়ে কমিউনিটি সেন্টারে আশ্রয় নিতে আসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তালিকায় তাদের বাড়ির ঠিকানা যুক্ত করা হয়েছিল। ডোহার্টির ভাষায়, “মা এবং তার শিশুরা আতঙ্কে ভেঙে পড়েছিল। শিশুরা বাড়িতে ফিরতে চাইছিল না।”

বুধবার রাতে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত একটি হোটেলে হামলার চেষ্টা চালানো হয়। পুলিশ ব্যারিকেড দেওয়ায় হামলাকারীরা সেখানে পৌঁছাতে না পারলেও পরে পাশের আবাসিক এলাকায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এর আগের রাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিবারগুলোকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে এবং যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে ২০১৫ সালে বেলফাস্টে আশ্রয় নেওয়া মোহাম্মদ বলেন, “আমরা এখানে নতুন জীবন শুরু করতে এসেছিলাম। আমরা কোনো অপরাধীর প্রতিনিধিত্ব করি না।” তার পরিচালিত একটি সুপারমার্কেটে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে দোকানের সব পণ্য ধ্বংস হয়ে যায়।

তিনি বলেন, “আমার শিশুরা কাঁদছে। আমরা ঘুমাতে পারছি না। আমার ছোট ছেলে বলছে, সে আর স্কুলে যেতে চায় না।”

দোকানটির মালিক সিরীয় বংশোদ্ভূত আরেকটি পরিবার। মালিকের ছেলে সুলতান বলেন, “টেলিভিশনের পর্দায় নিজের পারিবারিক ব্যবসা পুড়ে যেতে দেখা অত্যন্ত কষ্টের। নিরীহ মানুষরাই এর শিকার হয়েছে।”

দক্ষিণ বেলফাস্টের স্যান্ডি রো এলাকার দোকানগুলোর ওপরের ফ্ল্যাট থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের একজন কেফলুম টেকলি কাসা, যিনি স্ত্রী ও দুই মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে বন্ধুদের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, “এটি খুব কঠিন সময়। আমার স্ত্রী অত্যন্ত ভয় পেয়েছেন। এটি মানবিক আচরণ নয়।”

এই ঘটনার পর উত্তর আয়ারল্যান্ডে বর্ণবাদ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে বর্ণবাদপ্রসূত ঘটনার সংখ্যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং তা সাম্প্রদায়িক ঘটনার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

বেলফাস্ট ইসলামিক সেন্টারের প্রতিনিধি কাশিফ আকরাম বলেন, “আমরা এমন কিছু ঘটার আশঙ্কা করছিলাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “তথাকথিত কিছু গোষ্ঠী রাস্তায় টহল দিচ্ছে এবং অভিবাসীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করছে। উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান অভিবাসন নিয়ে জনমনে ভয়কে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।”

স্থানীয় ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করা ১৭৪ ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক টিম ম্যাগোয়ান বলেন, সাম্প্রতিক সহিংসতা হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ ও বিভক্তির সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ এটি।

তার মতে, উত্তর আয়ারল্যান্ডে এখনও সামাজিক বিভাজন গভীরভাবে বিদ্যমান। বহুজাতিক সমাজে বসবাসের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় ভিন্ন জাতিগত পটভূমির মানুষদের প্রতি ভুল ধারণা ও অবিশ্বাস সহজে তৈরি হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বেলফাস্টের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নয়; বরং এটি উত্তর আয়ারল্যান্ডে সামাজিক সংহতি, বর্ণগত সহনশীলতা এবং অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে। যুদ্ধ, নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে আসা বহু মানুষ এখন নতুন করে অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মুখোমুখি হয়েছেন।

কমিউনিটি নেতাদের আহ্বান, বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায় পুরো অভিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা উচিত। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণামূলক প্রচারণা ও ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে এসাইলাম প্রার্থীদের ইলেকট্রনিক ট্যাগ পরানোর প্রস্তাব

যুক্তরাজ্যে শরণার্থী মর্যাদা এখন অস্থায়ীঃ সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় সিরীয় গবেষক

যুক্তরাজ্যে ফিরতে পারবেন না শামীমা বেগম: সুপ্রিম কোর্ট